রংপুরে বন্ধুদের উদ্যোগে শিকলমুক্ত ২০০২ সালের মেধাবী হাছানুর

ছবি: আব্দুল্লাহিল শাহীন

শিকলবন্দি জীবন থেকে মুক্তি: তারাগঞ্জে বন্ধুর চিকিৎসায় এগিয়ে এলেন সহপাঠীরা। ডাকাতি ঘটনার পর মানসিক ভারসাম্য হারানো মেধাবী হাছানুরকে সুস্থ জীবনে ফেরাতে বন্ধুদের মানবিক উদ্যোগ।

আব্দুল্লাহিল শাহীন, তারাগঞ্জ (রংপুর): রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় দীর্ঘদিন শিকলে বন্দি জীবন কাটানো এক মেধাবী তরুণকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে মানবিক উদ্যোগ নিয়েছেন তারই স্কুলজীবনের বন্ধুরা। তাদের আন্তরিক যত্ন ও নিয়মিত চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থতার পথে ফিরছেন হাছানুর রহমান।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাছানুর রহমান ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী, দেখতে সুদর্শন এবং পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী। ২০০২ সালে এসএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে তিনি ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হন রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে।

কিন্তু হঠাৎ এক ভয়াবহ ঘটনার পর তার জীবন বদলে যায়। তারাগঞ্জ নতুন চৌপথী বাসস্ট্যান্ডের পাশে রংপুর–দিনাজপুর মহাসড়কের ধারে বাবা–মায়ের সঙ্গে বসবাস করতেন তিনি। এক রাতে ডাকাতদল তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে পরিবারের সদস্যদের কুপিয়ে গুরুতর জখম করে। সেই ঘটনার পর থেকেই ধীরে ধীরে মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকেন হাছানুর। ফলে অসমাপ্ত থেকে যায় তার পড়াশোনা ও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার স্বপ্ন।

হাছানুরের বাবা স্থানীয়ভাবে একটি ছোট হোটেল চালিয়ে সংসার চালাতেন। মা–বাবা জীবিত থাকা পর্যন্ত তারা ছেলের চিকিৎসা ও দেখাশোনা করতেন। কিন্তু তাদের মৃত্যুর পর অর্থাভাবে বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসা। পরিস্থিতির কারণে বড় ভাই একসময় তাকে শিকলে বেঁধে রাখতে বাধ্য হন। বর্তমানে সেই ভাই ভ্যান চালিয়ে কোনোরকমে সংসার চালান।

এমন কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন হাছানুরের স্কুলজীবনের বন্ধুরা। তারাগঞ্জ ও/এ সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ২০০২ সালের ব্যাচের বন্ধুরা সম্মিলিতভাবে তাকে চিকিৎসার আওতায় এনেছেন। তারা শিকল কেটে তাকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান এবং নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।

বন্ধুদের আন্তরিক সেবা ও চিকিৎসায় এখন অনেকটাই পরিবর্তন এসেছে হাছানুরের মধ্যে। আগে সারাক্ষণ চিৎকার–চেঁচামেচি করলেও এখন অনেক শান্ত এবং ভালো–মন্দ বুঝতে শুরু করেছেন। আগে শিকলে বাঁধা থাকলেও এখন তিনি মুক্তভাবে চলাফেরা করছেন।

শুধু চিকিৎসাই নয়, হাছানুরের মাথা গোঁজার ঠাঁই নিশ্চিত করতেও এগিয়ে এসেছেন তার বন্ধুরা। তার জন্য একটি নতুন ঘর নির্মাণের কাজও প্রায় শেষের দিকে।

এই মানবিক উদ্যোগে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন আব্দুল মতিন, হরলাল রায় ও জুয়েল ইসলাম বাবু। তারা নিয়মিত ওষুধ খাওয়ানো, গোসল করানোসহ সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করছেন।

বন্ধু হরলাল রায় বলেন, “আমরা তিন বন্ধু মিলে প্রতিদিন তাকে তিনবেলা ওষুধ খাওয়াই এবং তার দেখাশোনা করি। এখন সে আগের চেয়ে অনেক ভালো। আগে শিকলে বাঁধা থাকত, এখন আর লাগে না। আমাদের বিশ্বাস একদিন সে পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবে।”

বন্ধু আব্দুল মতিন বলেন, “হাছানুর খুব মেধাবী ছিল। তার জীবনে এমন কঠিন সময় আসবে কখনো ভাবিনি। বন্ধুর দুঃসময়ে চুপ করে থাকতে পারিনি। তাই আমরা সবাই মিলে তার পাশে দাঁড়িয়েছি।”

আরেক বন্ধু জুয়েল ইসলাম বাবু বলেন, “হাছানুর যেমন মেধাবী ছিল, তেমনি বিনয়ীও ছিল। আমরা তার বন্ধুরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাকে সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনব।”

বন্ধুত্বের এমন মানবিক দৃষ্টান্ত তারাগঞ্জবাসীর কাছে এখন অনুকরণীয় উদাহরণ হয়ে উঠেছে।