পাহাড় পেরিয়ে ফুটবলের নক্ষত্র ঋতুপর্ণা

বাংলাদেশের নারী ফুটবল দলের তারকা ঋতুপর্ণা চাকমা (১৭ নম্বর জার্সি)।

এশিয়া কাপ অভিষেকে চীনের জালে প্রায় গোল; বাঁ পায়ের জাদুতে হেরে গিয়েও জয় করেছিলেন লাখো হৃদয়

অসীম রায় (অশ্বিনী): পাহাড়ি জনপদের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মঞ্চে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখছেন ঋতুপর্ণা চাকমা। রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়ি গ্রামের এই তরুণী এখন বাংলাদেশের নারী ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ। সংগ্রাম, প্রতিভা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির সমন্বয়ে তিনি হয়ে উঠেছেন দেশের নতুন প্রেরণার প্রতীক।

পুরস্কার হাতে, SAFF চ্যাম্পিয়নশিপের সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফি নিয়ে হাসিমুখ।

২০২৬ সালের ৩ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার সিডনির ওয়েস্টার্ন সিডনি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপের ম্যাচে বাংলাদেশের নারী ফুটবল দল প্রথমবারের মতো মাঠে নামে। প্রতিপক্ষ ছিল নয়বারের চ্যাম্পিয়ন চীন। ম্যাচের শুরুতেই সাহসী ফুটবলে চমকে দেয় বাংলাদেশ।

ম্যাচের প্রায় ১৩–১৪ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে বল নিয়ে বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে যান ঋতুপর্ণা চাকমা। এক ডিফেন্ডারকে শারীরিকভাবে ছিটকে দিয়ে বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ে দূরপাল্লার শক্তিশালী শট নেন তিনি। বলটি বাতাসে ভেসে গোলপোস্টের দিকে এগিয়ে যায়। চীনের প্রায় ছয় ফুট লম্বা গোলরক্ষক চেন চেন লাফিয়ে উঠে কর্নারের বিনিময়ে দলকে রক্ষা না করলে সেই মুহূর্তেই হয়তো ইতিহাস রচনা হয়ে যেত।

ম্যাচ শেষে ঋতুপর্ণা নিজেই বলেন, “ভেবেছিলাম শটটা গোল হবে। হলে এটাকে আমার ক্যারিয়ারের সেরা গোল মনে করতাম।”

শেষ পর্যন্ত ম্যাচে বাংলাদেশ ২–০ গোলে পরাজিত হলেও ঋতুপর্ণার গতি, সাহস ও আক্রমণাত্মক ফুটবল নতুন আশা দেখিয়েছে বাংলাদেশের নারী ফুটবলে।

বাঁ পায়ের জাদুতে আলাদা ঋতুপর্ণা

ঋতুপর্ণা চাকমার খেলায় সবচেয়ে বড় শক্তি তার বাঁ পা। বাম প্রান্তের আক্রমণভাগে খেললেও তার গতি, বল নিয়ন্ত্রণ, শক্তিশালী শট এবং প্রাকৃতিক বাঁক নেওয়া বল প্রতিপক্ষের জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠে।

চীনের বিপক্ষে নেওয়া শটে তিনটি বিষয় স্পষ্ট ছিল—বিদ্যুৎগতি, শারীরিক শক্তি এবং বাঁ পায়ের প্রাকৃতিক বাঁক। বলটি গোলরক্ষকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল বলেই শেষ মুহূর্তে ঝাঁপিয়ে পড়ে কর্নারের বিনিময়ে রক্ষা করতে হয়।

একই ধরনের দূরপাল্লার বাঁ পায়ের শট দেখা গিয়েছিল এশিয়া কাপ বাছাইপর্বে মিয়ানমারের বিপক্ষে। সেবার দুটি দুর্দান্ত গোল করে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের মূল পর্বে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

পরিসংখ্যানও তার দক্ষতার প্রমাণ দেয়। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এখন পর্যন্ত ৩৭ ম্যাচে ১৩ গোল করেছেন ঋতুপর্ণা। এর মধ্যে বেশিরভাগ গোলই এসেছে তার বাঁ পায়ের শটে। সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে নেপালের বিপক্ষে জয়সূচক গোলটিও ছিল তার বাঁ পায়ের নিখুঁত আঘাত।

প্রতিপক্ষ দলগুলোও এখন তার সক্ষমতা সম্পর্কে সতর্ক। উত্তর কোরিয়ার কোচ পর্যন্ত মন্তব্য করেছেন, “১৭ নম্বর জার্সির খেলোয়াড়কে নিয়ে আমরা সতর্ক। সে বাম প্রান্ত দিয়ে খুব দ্রুত আক্রমণ করে এবং দূর থেকে শক্তিশালী শট নিতে পারে।”

পাহাড়ি গ্রাম থেকে জাতীয় দলের পথচলা

ঋতুপর্ণা চাকমার জন্ম রাঙামাটির কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়ি গ্রামে। তার বাবা ব্রজবাসী চাকমা ছিলেন স্বল্প জমির কৃষক। সংসারের আয় সীমিত হলেও পরিবারে ছিল বড় স্বপ্ন।

চার কন্যা সন্তানের পর ছেলে সন্তানের আশায় ছিলেন বাবা–মা। কিন্তু চতুর্থ সন্তান হিসেবেই জন্ম নেন ঋতুপর্ণা। বাবার বোন নিলোবানু চাকমা পশ্চিমবঙ্গের অভিনেত্রী ঋতুপর্ণা সেনগুপ্তের ভক্ত হওয়ায় তার নাম রাখা হয় ঋতুপর্ণা।

শৈশবেই জীবনে নেমে আসে বড় দুঃসময়। ব্রজবাসী চাকমা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ২০১৫ সালে মারা যান। পাঁচ সন্তান নিয়ে মা ভুজপতি চাকমা পড়েন চরম আর্থিক সংকটে।

ফুটবলের পথে সংগ্রাম

মগাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় ছেলেদের সঙ্গে খেলতে খেলতেই ফুটবলের প্রতি আগ্রহ জন্মে ঋতুপর্ণার। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা তার প্রতিভা দেখে উৎসাহ দেন।

তার উদ্যোগেই ২০১৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকেএসপিতে ট্রায়াল দিতে যান ঋতুপর্ণা। সেখানে বাঁ পায়ের অসাধারণ দক্ষতায় কোচদের নজর কাড়েন এবং ট্রায়ালে প্রথম হয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান।

তবে সেই পথ সহজ ছিল না। ভর্তি ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। সেই অর্থ জোগাড়ে এগিয়ে আসেন প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমা। পরিবারের আর্থিক সংকটের মধ্যে মেজ বোন, যিনি চট্টগ্রামের একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন, নিজের কানের দুল বন্ধক রেখে বিকেএসপির বকেয়া পরিশোধ করেন।

জাতীয় দলে উত্থান ও সাফল্য

২০১৬ সালেই বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের ক্যাম্পে ডাক পান ঋতুপর্ণা চাকমা। বয়সভিত্তিক দল পেরিয়ে ধীরে ধীরে জায়গা করে নেন জাতীয় দলে।

২০২২ ও ২০২৪ সালে দক্ষিণ এশীয় নারী ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ২০২৫ সালে এশিয়া কাপ বাছাইপর্বে মিয়ানমারের বিপক্ষে জোড়া গোল করে বাংলাদেশকে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের মূল পর্বে তুলতে বড় অবদান রাখেন।

খেলাধুলার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনও চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ২০২৩ সালে খেলোয়াড় কোটায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা অর্জনের লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন।

অনুপ্রেরণার প্রতীক

এশিয়া কাপের অভিষেক ম্যাচে পরাজয়ের পরও ঋতুপর্ণার চোখে ছিল দৃঢ় আত্মবিশ্বাস। সেই মুখ যেন প্রতিফলিত করে বাংলাদেশের অসংখ্য সংগ্রামী নারীর প্রতিচ্ছবি—যারা প্রতিদিন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে এগিয়ে চলেন।

এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সামনে এখন উজবেকিস্তান ও উত্তর কোরিয়ার বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ। সেই লড়াইয়েও দলের অন্যতম ভরসা এই পাহাড়ি তারকা।

বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য অঞ্চলের এই কন্যা প্রমাণ করেছেন—প্রতিভা ও অধ্যবসায় থাকলে প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও বিশ্বমঞ্চে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। ঋতুপর্ণা চাকমার উত্থান তাই শুধু একজন খেলোয়াড়ের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের নারী শক্তি, সংগ্রাম এবং স্বপ্নের এক উজ্জ্বল প্রতীক।