বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়াল

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের জেরে সরবরাহ সংকট; বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা, শেয়ারবাজারেও বড় ধাক্কা।
টুইট ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের চলমান সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে, যা ২০২২ সালের পর প্রথমবার।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা তীব্র হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ কমে যাচ্ছে। এর ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক শেয়ারবাজারেও দরপতন দেখা দিয়েছে।
সপ্তাহান্তে ইরানের রাজধানী তেহরান ও আশপাশের অন্তত পাঁচটি জ্বালানি স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, হামলার পর রাজধানীর কিছু এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় কুয়েতের জাতীয় তেল কোম্পানিও সতর্কতামূলকভাবে উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত এক সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে। সাধারণত বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। পথটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে তেলের দামে। এশিয়া–প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের লেনদেন শুরুতেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১০৮ দশমিক ১০ ডলারে পৌঁছায়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড পশ্চিম টেক্সাস মধ্যবর্তী তেলের দাম ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়ে ১০৮ দশমিক ৭২ ডলারে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি বিশ্বের নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য খুবই সামান্য মূল্য এবং এটি যুদ্ধ পরিস্থিতির স্বল্পমেয়াদি প্রভাব। তার মতে, ইরানের পারমাণবিক হুমকি নির্মূল হলে তেলের দাম দ্রুত কমে আসবে।
অন্যদিকে ইরান সতর্ক করে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক মুখপাত্র বলেন, যদি ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারের বেশি তেলের দাম মেনে নেওয়ার প্রস্তুতি থাকে, তাহলে এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারেও দেখা যাচ্ছে। সোমবার টোকিওতে জাপানের নিক্কেই সূচক ৬ দশমিক ৩ শতাংশ কমেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি সূচক কমেছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ার এএসএক্স–২০০ সূচক নেমেছে প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি বৈশ্বিক বাজারে বড় চাপ সৃষ্টি করেছে এবং পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার কোনো ইঙ্গিত নেই। বছরের শুরুতে যেখানে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬০ ডলার ছিল, সেখানে এখন তা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বেড়ে গেছে।
কাতারের জ্বালানি মন্ত্রীও সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানিকারক দেশগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই উৎপাদন বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী শত শত তেলবাহী জাহাজ বর্তমানে স্থবির অবস্থায় রয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুমকি দিয়েছে, এই পথ ব্যবহার করলে যেকোনো জাহাজে হামলা চালানো হতে পারে।
যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও বড় অস্থিরতা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতি ও জ্বালানি বিশ্লেষকেরা।






