যমুনেশ্বরীতে অবৈধ বালু উত্তোলন: সড়ক ও বাঁধ হুমকিতে

সেতু–সড়ক ও বাঁধ হুমকিতে; ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন হাজারো ট্রাক্টর বালু পরিবহন, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ।

আব্দুল্লাহিল শাহীন: রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলায় যমুনেশ্বরী নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের ফলে সেতু, সড়ক ও নদীর বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে একাধিক স্থানে ড্রেজার বসিয়ে প্রকাশ্যে বালু উত্তোলন করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বাড়ছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি প্রভাবশালী চক্র অবাধে এই অবৈধ বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের দালালপাড়া, নাটারামসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় যমুনেশ্বরী নদীর মাঝখানে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে দীর্ঘ পাইপের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। পরে সেই বালু নদীর তীরে জমা করে ট্রাক্টর ও ট্রাকে করে বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বালুবাহী ট্রাক্টর নাগেরহাট এলাকার সড়ক দিয়ে চলাচল করছে। এতে ধুলাবালিতে পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি ভারী যানবাহনের চাপে এলাকার সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নাগেরহাট বাজার ও আশপাশের সড়কে বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এলাকাবাসী আরও জানান, বালুবাহী যানবাহনের অবাধ চলাচলের কারণে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্মিত পাকা সড়ক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক স্থানে সড়কের পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় খাদ সৃষ্টি হয়েছে। ফলে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

শুধু সড়ক নয়, অবৈধভাবে নদী খননের কারণে যমুনেশ্বরী নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ভাঙনের আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর মতে, এভাবে নদীর গভীর থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত থাকলে নদীর গতিপথ পরিবর্তনসহ বড় ধরনের ভাঙন দেখা দিতে পারে। এতে হুমকির মুখে পড়তে পারে যমুনেশ্বরী সেতু, মিঠাপুকুর–ফুলবাড়ী মহাসড়ক এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্মিত গ্রাম প্রতিরক্ষা বাঁধ।

নাগেরহাট এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নদীর নাটারাম এলাকা থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে অন্তত ১৮টি অবৈধ বালু উত্তোলন কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। এসব স্থানে ড্রেজার বসিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বালু তোলা হচ্ছে। তাদের দাবি, প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার ট্রাক্টর ও ট্রাকে করে এসব বালু উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের উপজেলায় সরবরাহ করা হয়।

অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ইতোমধ্যে দুর্ঘটনাও ঘটেছে। গত ৯ ফেব্রুয়ারি নদীর একটি বালুর গর্তে পড়ে সিয়াম (৮) নামে এক শিশু শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী কয়েকটি ড্রেজার মেশিনে আগুন দেয় এবং বালুবাহী ট্রাক্টর ভাঙচুর করে। পরে প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঝে মাঝে প্রশাসন অভিযান চালালেও তা সাময়িক। অভিযান শেষ হলেই আবার আগের মতো বালু উত্তোলন শুরু হয়ে যায়। ফলে অবৈধ বালু ব্যবসা বন্ধ হচ্ছে না।

বদরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাসান জাহিদ সরকার বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের বিষয়ে অভিযোগ পেলেই পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ব্যবস্থা নেয় এবং বালুর পয়েন্ট বন্ধ করে দেয়।

বদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আঞ্জুমান সুলতানা বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। আইন অমান্য করে কেউ বালু উত্তোলন করলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক এনামুল আহসান বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে উপজেলা প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ট্রাক্টর জব্দ ও জরিমানা করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।

এদিকে এলাকাবাসী দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে যমুনেশ্বরী নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সেতু, সড়ক ও নদীর বাঁধসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।