দেশে জ্বালানি তেলের মজুত ১৪ দিনের: দাম বাড়ার শঙ্কা নেই

যুদ্ধ পরিস্থিতি নজরে বিকল্প বাজার খোঁজা হচ্ছে, সরবরাহ নিরাপত্তা জোরদার। আন্তর্জাতিক মান ৯০ দিন, দেশীয় সক্ষমতা ৪৫-৫০ দিন।

টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, দেশের জ্বালানি তেলের মোট মজুত বর্তমানে ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন, যা ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস তেল ৯৩ দিন এবং জেট ফুয়েল ৫৫ দিন পর্যাপ্ত সরবরাহের সক্ষম।

মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিপিসি ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি মো. রেজানুর রহমান বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতে সোমবার পর্যন্ত সাতটি তেল জাহাজের এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) সম্পন্ন হয়েছে এবং আমদানি কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি সরকারের নজরেও রয়েছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় বিকল্প উৎস ও বাজার খোঁজা হচ্ছে।

বিপিসি জানিয়েছে, বর্তমান মজুত ও আমদানি পরিকল্পনা বিবেচনায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কোনো তাৎক্ষণিক শঙ্কা নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা থাকলেও সরবরাহ শৃঙ্খল সচল রাখতে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করা হচ্ছে এবং জ্বালানি বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি রাখা হয়েছে।
সূত্র: বিপিসি সংবাদ সম্মেলন, সরকারি ব্রিফিং।

তেল সংকটের আগাম বার্তা: মজুদ বাড়াতে; সতর্ক করেছিল টুইটনিউজ২৪

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters এবং BBC News-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার জেরে বৈশ্বিক তেলের বাজার অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সংবাদে বলা হয়েছে, বর্তমানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৭৭–৭৯ ডলার প্রতি ব্যারেলের ঘরে ঘোরাফেরা করছে এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ঝুঁকি বৃদ্ধির কারণে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ যোগ হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য যে, টুইটনিউজ২৪ কয়েক সপ্তাহ (বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৬) আগেই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে সতর্ক করেছিল “আন্তর্জাতিক বাজার তুলনামূলক নিম্নমুখী থাকতেই কৌশলগত তেল মজুদ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।” তখন ব্রেন্ট ৭০–৭২ ডলারের পরিসরে ছিল; ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি স্পষ্ট হলেও বাজার তা পুরোপুরি মূল্যায়ন করেনি।

মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ইরান–ইসরায়েল–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার জেরে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৭৭–৭৯ ডলার প্রতি ব্যারেলের ঘরে ঘোরাফেরা করছে। সরবরাহ শৃঙ্খল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় ঊর্ধ্বমুখী চাপ অব্যাহত। কৌশলগত জলপথ Strait of Hormuz–এ জাহাজ চলাচল নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় বাজারে ‘রিস্ক প্রিমিয়াম’ যুক্ত হচ্ছে—যার অভিঘাত আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর সরাসরি পড়ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। দেশের ৯০ শতাংশের বেশি জ্বালানি মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ৫ ডলার মূল্যবৃদ্ধিই আমদানি বিলে শত শত মিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত চাপ তৈরি করতে পারে। রিজার্ভ, ভর্তুকি, বাজেট ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতি—সব সূচকে সমান্তরাল চাপের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন—তৎক্ষণিকভাবে কৌশলগত মজুদ বাড়ানো, সরবরাহ উৎস বৈচিত্র্যকরণ, দীর্ঘমেয়াদি ক্রয়চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী নীতিতে জোর দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া রেমিট্যান্স প্রবাহ সচল রাখা এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে সহায়তা করে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অতিরিক্ত চাপ কমানো উচিত।

বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মজুদ কত দিনের রাখা উচিত

আন্তর্জাতিক এনার্জি এজেন্সি (IEA)-এর সদস্য দেশগুলোর জন্য নেট তেল আমদানির কমপক্ষে ৯০ দিনের সমান জরুরি মজুদ রাখা বাধ্যতামূলক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ম অনুসারে ৯০ দিনের নেট আমদানি বা ৬১ দিনের দেশীয় খরচ—যেটি বেশি, সেটি রাখতে হয়।

বাংলাদেশ IEA সদস্য না হলেও, দেশের সামগ্রিক স্টোরেজ সক্ষমতা প্রায় ৪৫-৫০ দিনের চাহিদার সমান। বিপিসি সাধারণত অপারেশনাল নিরাপত্তার জন্য ৩০-৪৫ দিনের মজুদ লক্ষ্য রাখে। বর্তমানে (৩ মার্চ) ডিজেলের মজুদ মাত্র ১৪ দিনের, পেট্রোল ১৫ দিনের, অকটেন ২৮ দিনের—যা যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ঝুঁকিপূর্ণ।

বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান আজ জানিয়েছেন, মোট ১ লাখ ৩৬ হাজার মেট্রিক টন মজুদ রয়েছে এবং বিকল্প আমদানি সূত্র খোঁজা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তায় কমপক্ষে ৪০-৬০ দিনের স্ট্র্যাটেজিক রিজার্ভ গড়ে তোলা জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

যদিও সরকার মার্চ মাসে খুচরা জ্বালানির দাম স্থিতিশীল রেখেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য ১০০ ডলারের ঘরে পৌঁছলে ভর্তুকির বোঝা বহুগুণ বেড়ে বাজেট ব্যবস্থাপনায় কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তেল ব্যয়ের বৃদ্ধি বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ, শিল্প খাতে প্রতিযোগিতা ও পরিবহন খরচ বাড়িয়ে খাদ্যসহ নিত্যপণ্যের মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। অর্থনীতির বহুমাত্রিক চাপে নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা।