বান্দরবানে ৮ ইটভাটা মালিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ ৮ মালিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা; ফাইতংয়ে জরিমানা, জেলায় সক্রিয় ৪২ ভাটা।

অসীম রায় (অশ্বিনী): পার্বত্য জেলা বান্দরবান-এ অবৈধভাবে ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনার অভিযোগে সাবেক এক উপজেলা চেয়ারম্যানসহ আটজন ইটভাটা মালিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন আদালত।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত) এবং ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-এর আওতায় দায়েরকৃত একাধিক মামলার শুনানি শেষে বান্দরবান সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও স্পেশাল পরিবেশ আদালতের বিচারক মো. আনোয়ার হোসেন এ পরোয়ানা জারি করেন।

রবিবার (১ মার্চ) আদালতের পেশকার মাহবুব কাদের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

আদালত সূত্র জানায়, পরিবেশ অধিদপ্তরের দায়ের করা পাঁচটি মামলায় অভিযুক্তরা নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজির না হওয়ায় তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আসামিদের গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া ব্যক্তিরা হলেন, থানচি উপজেলার এমএসবি ইটভাটার মালিক ও যুবলীগ নেতা আনিসুর রহমান সুজন (মামলা নং–০৩/২৬); আলীকদম উপজেলার এবিএম ইটভাটার মালিক আওয়ামী লীগ নেতা সামছুদ্দিন ও এখলাচুর রহমান (মামলা নং–০৫/২৬); ইউবিএম ইটভাটার মালিক, আলীকদম উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জামাল উদ্দিন (মামলা নং–০৪/২৬); এফবিএম ইটভাটার মালিক ও সাবেক বন ও পরিবেশমন্ত্রীর ভাই শওকত তালুকদার (মামলা নং–০২/২৬); এবং নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বিবিএম ইটভাটার মালিক মোহাম্মদ আবু ছৈয়দ, আবুল বশর ও ফরিদ আহমদ (মামলা নং–০১/২৬)।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বান্দরবানের বিভিন্ন উপজেলায় প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়াই প্রায় ৭০টি ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৪২টি ভাটা সচল রয়েছে। পূর্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে একাধিক অভিযান চালিয়ে কয়েকটি ভাটাকে অর্থদণ্ড প্রদান এবং বুলডোজার ও স্কেভেটরের সাহায্যে আংশিকভাবে উচ্ছেদ করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অবৈধ কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে লামা উপজেলার ফাইতং ইউনিয়নে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি উপজেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে KBC ও BBM নামের দুইটি ইটভাটায় বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় KBC-কে ৩ লাখ টাকা এবং BBM-কে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই ইউনিয়নে পৃথক অভিযানে আরও পাঁচটি ইটভাটাকে মোট ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। প্রশাসন জানায়, ফাইতং ইউনিয়নে ৩১টি অবৈধ ইটভাটা রয়েছে, যেগুলোর অধিকাংশই পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক রেজাউল করিম বলেন, “অবৈধভাবে ইটভাটা স্থাপন ও পরিচালনা পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ইতোমধ্যে জেলায় প্রায় ৮০ লাখ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে এবং একাধিক মামলার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পরিবেশ রক্ষায় অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনজুর আলম জানান, দায়েরকৃত মামলাগুলো জামিন অযোগ্য ধারায় অন্তর্ভুক্ত। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, পাহাড়ি জেলা বান্দরবানে অবৈধ ইটভাটার কারণে বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়ছে। এতে স্থানীয় কৃষিজমি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

আইন ও পরিবেশ রক্ষায় কঠোর নজরদারি ও দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপই পারে পাহাড়ি জেলার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করতে, এমন মত সংশ্লিষ্টদের।