বান্দরবানে সরকারি কাজে শঙ্খের পাথর, নদী ক্ষতবিক্ষত

বান্দরবান শঙ্খ নদীতে বিস্ফোরণে পাথর উত্তোলন, সরকারি ভবনে সেই পাথর ব্যবহারের অভিযোগ
অসীম রায় (অশ্বিনী): স্বচ্ছ স্রোত ও পাথরময় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত শঙ্খ নদী এখন রাতের বিস্ফোরণে ক্ষতবিক্ষত—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। গভীর রাতে বারুদ ফাটিয়ে নদীর বুক চিরে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে এবং সেই পাথর ব্যবহার হচ্ছে সরকারি ভবন নির্মাণকাজে—এ অভিযোগ ঘিরে চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে থানচি উপজেলার তিন্দু বাজার এলাকায়।
রাতে উত্তোলন, দিনে পরিবহন
সরেজমিনে দেখা যায়, তিন্দু বাজারমুখী বিজিবি চেকপোস্টসংলগ্ন নদীপাড়ে বড় আকারের পাথর ভাঙার চিহ্ন ছড়িয়ে আছে। স্থানীয়দের দাবি, গত ডিসেম্বর থেকে প্রায় প্রতিরাতে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যাচ্ছে। রাতেই পাথর ভেঙে ছোট করা হয় এবং ক্রাশার মেশিনে গুঁড়ো করে দিনের বেলায় নির্মাণস্থলে নেওয়া হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা জানান, “রাতে বিকট শব্দ হয়, সকালে গিয়ে দেখি পাথর নেই।”
সরকারি প্রকল্পে ব্যবহার
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উত্তোলিত পাথর তিন্দু মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয় ভবন, একটি বৌদ্ধ বিহার এবং তিন্দু বাজারের ‘বাজার সেট’ নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড–এর অর্থায়নে প্রায় ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে বিদ্যালয় ভবন নির্মাণের কাজ পায় ‘আগমা এন্টারপ্রাইজ’। প্রতিষ্ঠানটির মালিক রেমাক্রী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মুইশৈথুই মারমা রনি। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পুনরায় কাজ শুরু হয়।
‘সমঝোতা’ প্রশ্নে বিতর্ক
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বামং খিয়ান বলেন, ভবন না থাকায় পাঠদান ব্যাহত হচ্ছিল। ঠিকাদার ও সাইট তদারকি প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনার পর স্থানীয় পাথর ও বালি ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ায় কাজ শুরু হয়। তবে লিখিত অনুমতির তথ্য মেলেনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, দ্রুত কাজ শেষ করতে প্রশাসন বা সংশ্লিষ্টদের নীরব সম্মতিতে স্থানীয়ভাবে পাথর উত্তোলনের ‘শর্তে’ কাজ এগিয়েছে।
রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
স্থানীয় যুবলীগ নেতা শৈবাসিং মারমা দাবি করেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের নির্দেশ ও অর্থায়নে তিনি শঙ্খ নদী থেকে পাথর ও বালি উত্তোলন করছেন। রেমাক্রী বাজারের ছাত্রলীগ কর্মী হ্লাচিংমং মারমার সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশ ও পর্যটন ঝুঁকিতে
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেন, শঙ্খ নদীর পাথরময় প্রাকৃতিক দৃশ্য তিন্দুর অন্যতম পর্যটন আকর্ষণ। অপরিকল্পিত উত্তোলন চলতে থাকলে নদীর গতিপ্রকৃতি বদলে যেতে পারে, বর্ষায় ভাঙন বাড়তে পারে এবং জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়তে পারে। এক ইউপি সদস্য বলেন, “উন্নয়ন দরকার, কিন্তু নদী ধ্বংস করে নয়।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
উন্নয়ন বোর্ডের বান্দরবান ইউনিটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইয়াছির আরফাত বলেন, তিন্দু পর্যন্ত সড়ক ও ভবন নির্মাণে ইটের কংক্রিট ব্যবহারের বিধান রয়েছে, স্থানীয় পাথর ব্যবহারের সুযোগ নেই। অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রেজাউল করিম বলেন, খনিজসম্পদ উত্তোলন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বিষয় হলেও পরিবেশগত ক্ষতির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হবে।
স্থানীয়রা অবিলম্বে অবৈধ পাথর উত্তোলন বন্ধ, জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নদীপাড় পুনরুদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন। তারা বান্দরবানের সংসদ সদস্য রাজপুত্র সাচিংপ্রু জেরীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ ঘটনায় উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা, পরিবেশ সুরক্ষা ও প্রশাসনিক নজরদারি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।







