যমুনায় নাব্য বিপর্যয়: থমকে গেল আট নৌঘাট

সংগৃহীত

উজানে বাঁধ নির্মাণের প্রভাব, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ১৪১ চর গ্রামের মানুষ।

টুইট প্রতিবেদক: বগুড়া অংশের যমুনা নদী আজ আর প্রমত্তা নয়, শুষ্ক মৌসুম এলেই নদীর বুকজুড়ে ধু-ধু বালুচর, ডুবোচর আর অগভীর পানির দীর্ঘশ্বাস। স্থানীয়দের ভাষ্য ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য বলছে, উজানে বাঁধ নির্মাণ ও পানিপ্রবাহে নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে দিন দিন তীব্র হচ্ছে নাব্য সংকট।

চলতি মৌসুমে ধুনট, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলার ১১টি ইউনিয়নের আটটি নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে; বিপাকে পড়েছেন ১৪১ চর গ্রামের দুই লক্ষাধিক মানুষ। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে বেড়েছে যাত্রীভোগান্তি, স্থবির হয়েছে জীবিকা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ডুবোচর ও পানির স্বল্পতায় সারিয়াকান্দির পৌর এলাকার কালিতলা থেকে মাদারগঞ্জ আন্তঃজেলা নৌপথও বন্ধ হওয়ার উপক্রম। একসময় যে নদীপথে জাহাজ চলত, সেখানে এখন ডিঙি নৌকাও আটকে যায় বালুর চরে। মাঝি আব্দুল মতিন, হাটফুলবাড়ির বালুচরা গ্রামের বাসিন্দা, বললেন, “বর্ষা ছাড়া অন্য সময় নৌকা নিয়ে গেলে তলদেশ বালুতে আটকে যায়। বছরের কয়েক মাস বেকার থাকতে হয়। বয়স হয়েছে, পেশা বদলানোও কঠিন।” নদীভাঙনে ১৫ বছরে পাঁচবার ঠিকানা বদলালেও মাঝির হাল ছাড়েননি তিনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ যমুনা নদীর বাংলাদেশ অংশ ২২০ কিলোমিটার। নদীর গড় গভীরতা যেখানে প্রায় সাড়ে ৯ মিটার ছিল, সেখানে অনেক স্থানে তা নেমে এসেছে প্রায় দুই মিটারে, কোথাও আরও কম। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ভারত ও চীনের অভ্যন্তরে অন্তত ১৪টি বাঁধ নির্মাণের ফলে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহে বিঘ্ন ঘটছে। ভাটির দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এর প্রভাব দ্বিমুখী, বর্ষায় আকস্মিক বন্যা, শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানিস্বল্পতা ও বালুচর বিস্তার।

সারিয়াকান্দির কর্নিবাড়ি ইউনিয়নের শোনপচা চর গ্রামের আয়েন উদ্দিন জানান, নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে তাঁর বসতভিটা। অবশিষ্ট জমিতে চাষাবাদও অনিশ্চিত, শুষ্ক মৌসুমে তপ্ত বালু, বর্ষায় পানিতে ডুবে থাকে জমি। এই অনিশ্চয়তা চরবাসীর জীবনে স্থায়ী অনিশ্চয়তার ছায়া ফেলেছে।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার সুমাইয়া ফেরদৌস বলেন, শুষ্ক মৌসুমে নদী কার্যত বালুচরে পরিণত হয়; ড্রেজিং জরুরি। এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সারিয়াকান্দি উপবিভাগীয় প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির জানান, বাঙালী নদী খননের আওতায় এলেও যমুনা খননের কোনো প্রকল্প সরকারের কাছে নেই। অতীতে বিআইডব্লিউটিআই আংশিক সমীক্ষা চালালেও তা ফলপ্রসূ হয়নি, প্রতি বছর কয়েক হাজার টন বালু জমার কারণে খনন টেকসই হয় না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনা, উজান-ভাটির মধ্যে তথ্যভিত্তিক পানি বণ্টন চুক্তি এবং বিজ্ঞানসম্মত ড্রেজিং ছাড়া সমাধান মিলবে না। নচেৎ প্রমত্তা যমুনার বুকজুড়ে বালুচরের বিস্তার বাড়তেই থাকবে, চরাঞ্চলের মানুষ আরও প্রান্তিক হবে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে, নদীকেন্দ্রিক এই জনপদের ভবিষ্যৎ যে মরুকরণের মুখে, তার ইঙ্গিত মিলছে আজকের ধু-ধু বালুচরেই।