সন্তান জন্ম মানেই জীবনসংকট, পাহাড়ে হাসপাতালের অপেক্ষায় রেমাক্রীর মায়েরা

পাহাড় পেরিয়ে সন্তান জন্ম—রেমাক্রীর প্রসূতি মায়েদের বাঁচাতে জরুরি প্রয়োজন হাসপাতাল!
বান্দরবান প্রতিনিধি: বাংলাদেশের মানচিত্রে হয়তো ছোট একটি নাম—রেমাক্রী। কিন্তু বান্দরবানের থানচি উপজেলার এই দুর্গম পাহাড়ি জনপদে প্রতিটি সন্তান জন্ম যেন মৃত্যুর সঙ্গে এক নীরব যুদ্ধ। এখানে মা হওয়া আনন্দের নয়, বরং অনিশ্চয়তা আর ভয় নিয়ে শুরু হয় জীবনের সবচেয়ে কঠিন লড়াই।
পাহাড়, ঝিরি আর উত্তাল নদী ঘেরা রেমাক্রী ইউনিয়নে বসবাস প্রায় ১৩ হাজার মানুষের। তাদের মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজার নারী। অথচ পুরো এলাকায় নেই একটি সরকারি হাসপাতাল, নেই জরুরি প্রসূতি সেবা। গর্ভবতী নারীরা নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত।
কোনো প্রসূতির হঠাৎ ব্যথা উঠলে পরিবারের সদস্যদের সামনে একটাই পথ খোলা থাকে—নদীপথে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা। থানচি সদরে পৌঁছাতে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৫০ কিলোমিটার পথ, সময় লাগে চার ঘণ্টারও বেশি। বর্ষা মৌসুমে সেই পথ হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ। অনেক সময় নৌকাতেই কিংবা পাহাড়ি পথে সন্তান জন্ম নেয়। কেউ বেঁচে যান, কেউ আর ফিরে আসেন না।
স্থানীয় এক গর্ভবতী নারী বলেন, “এখানে হাসপাতাল নাই। ব্যথা উঠলে আল্লাহর উপর ভরসা ছাড়া কিছু করার থাকে না।”
রেমাক্রী বাজারের ছোট্ট একটি অস্থায়ী ক্লিনিক এখন পুরো ইউনিয়নের একমাত্র আশ্রয়। স্বাস্থ্যকর্মী ওয়ং নুচিং মারমা সীমিত সরঞ্জাম নিয়ে বছরের পর বছর প্রসূতি মায়েদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তার হাত ধরেই জন্ম নিয়েছে শতাধিক শিশু। কিন্তু জটিল প্রসব হলে তারও কিছু করার থাকে না।
এক নবজাতকের মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “তিন দিন তিন রাত ব্যথা সহ্য করেছি। পরে কষ্ট করে হাসপাতালে গিয়ে সিজার করতে হয়েছে। এখানে হাসপাতাল থাকলে এত কষ্ট হতো না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, অর্থবান পরিবারগুলো কোনোভাবে শহরে গিয়ে চিকিৎসা নিতে পারলেও দরিদ্র পাহাড়ি পরিবারগুলোর জন্য সন্তান জন্ম দেওয়া মানেই জীবনের ঝুঁকি নেওয়া।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে রেমাক্রী এলাকায় জন্ম হয়েছে প্রায় ৭২০ শিশুর। এর মধ্যে বেশ কয়েকজন শিশু প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়াই এর অন্যতম কারণ।
রেমাক্রী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুশৈথুই মারমা জানান, সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে থাকছেন প্রসূতি মায়েরা। জরুরি মুহূর্তে যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাব পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তোলে।
বান্দরবান জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, দুর্গম এলাকায় নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তবে স্থানীয়দের দাবি—সচেতনতা নয়, এখন প্রয়োজন স্থায়ী হাসপাতাল।
রেমাক্রীর মায়েদের আবেদন খুব সাধারণ, সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যেন আর কোনো মায়ের জীবন ঝরে না যায়।
রাষ্ট্রের উন্নয়নের আলো এখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছাচ্ছে।
একটি হাসপাতালই বদলে দিতে পারে রেমাক্রীর হাজারো মায়ের ভাগ্য। এখন প্রয়োজন দ্রুত মানবিক উদ্যোগ।






