পাকিস্তানের বিমান হামলায় আফগানিস্তান উত্তপ্ত, ১৩৩ তালেবান নিহতের দাবি

পাকিস্তান “অপারেশন গজব লিল হক” চালিয়ে তালেবানের দুটি ব্রিগেড সদর ধ্বংসের দাবি। তালেবানের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের গুঞ্জন, অফিসিয়াল নিশ্চিতকরণ নেই।

টুইট প্রতি‌বেদক: আফগানিস্তান–পাকিস্তান সীমান্তে চলমান উত্তেজনা পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী শুক্রবার (২৭ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮:৩০ মিনিট পর্যন্ত পাকিস্তান আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে একাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে।

পাকিস্তান এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে “অপারেশন গজব লিল হক”, যা তাদের ভাষ্যে সাম্প্রতিক সীমান্ত হামলার ‘যথাযথ প্রতিক্রিয়া’। পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, হামলায় তালেবানের দুটি ব্রিগেড সদর দপ্তর, তিনটি সামরিক কমান্ড স্থাপনা, অস্ত্রাগার এবং ৮০টির বেশি ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান ধ্বংস হয়েছে।

দেশটির তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার জানিয়েছেন, অভিযানে অন্তত ১৩৩ তালেবান যোদ্ধা নিহত ও ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছে বলে তাদের গোয়েন্দা মূল্যায়নে উঠে এসেছে।
স্থানীয় সময় রাত প্রায় ১টা ৫০ মিনিটে কাবুল শহরে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়, যা রাজধানীতে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি করে।

তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ পাকিস্তানি বিমান হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেননি। তালেবান অভিযোগ করেছে, পাকিস্তান সামরিক স্থাপনার পাশাপাশি বেসামরিক এলাকাও লক্ষ্যবস্তু করেছে। তবে পাকিস্তান দাবি করছে, হামলা পরিচালিত হয়েছে আফগান ভূখণ্ডে সক্রিয় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান ও ইসলামিক স্টেট খোরাসান সংশ্লিষ্ট ঘাঁটির বিরুদ্ধে।

বর্তমান উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে তালেবানের পাল্টা সীমান্ত অভিযানের পর। তালেবান দাবি করে, তারা পাকিস্তানের ১৭ থেকে ১৯টি সীমান্ত পোস্ট দখল করেছে এবং সংঘর্ষে ৪০ থেকে ৫৫ পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে।

ইসলামাবাদ এই দাবি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে ঘটনাকে ‘অপ্ররোচিত হামলা’ উল্লেখ করে শক্ত প্রতিক্রিয়ার ঘোষণা দেয়। এর আগে শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) পাকিস্তান নাঙ্গারহার, পাকতিকা ও খোস্ত অঞ্চলেও বিমান হামলা চালিয়েছিল।

পাকিস্তানের ভাষ্য অনুযায়ী সেখানে ৭০ থেকে ৮০ জঙ্গি নিহত হলেও আফগান কর্তৃপক্ষ ও জাতিসংঘ জানিয়েছিল, নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৩ থেকে ১৮ বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারায়।
এদিকে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে কাবুলে তালেবানের অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষের খবর।

কাবুলভিত্তিক স্থানীয় সংবাদমাধ্যম আমাজ নিউজ দাবি করেছে, পাকিস্তানি হামলার পর তালেবানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ভবনের ভেতরে ভারী গোলাগুলি ও তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্যে বলা হচ্ছে, তালেবানের কান্দাহারভিত্তিক কঠোরপন্থী নেতৃত্ব এবং কাবুলভিত্তিক প্রশাসনিক গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতা ও নীতি বিরোধকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

কিছু সূত্র এমনও দাবি করেছে যে প্রেসিডেন্সিয়াল প্রাসাদ সংলগ্ন এলাকাতেও গুলির শব্দ শোনা গেছে। তবে এসব তথ্য এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং তালেবানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেয়নি।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকটে রূপ নিতে পারে। কাতারের মধ্যস্থতায় চলমান অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে সীমান্ত এলাকাগুলোতে চলাচল সীমিত করা হয়েছে এবং উভয় দেশের সামরিক বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্কের দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, সীমান্ত নিরাপত্তা সংকট এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বর্তমানে পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং নতুন সামরিক বা কূটনৈতিক ঘোষণা দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।