অগ্নিঝরা আলিয়া রহমান: বাংলাদেশি–আমেরিকান সেই নারীই আমাদের গর্ব

দু’বার জোরপূর্বক আটক হয়েও যিনি ভাঙেননি, বরং আগুন হয়ে জ্বলে উঠেছেন। অটিস্টিক, প্রতিবন্ধী, তবু হৃদয়ের আগুন নিয়ে যে নারী অন্ধকারকে জ্বালিয়ে দিয়েছেন।
বদিউল আলম লিংকন: “আলিয়া রহমান” এই নামটি শুনলেই বুকের ভেতর কিছু একটা কেঁপে ওঠে। চোখে জল চলে আসে। গলা বন্ধ হয়ে যায়।
৪৩ বছরের এক বাংলাদেশি–আমেরিকান মা, বোন, যোদ্ধা। অটিজমের অন্ধকারে বেঁচে থাকা এক নারী। ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরির ক্ষত নিয়ে প্রতিদিন যুদ্ধ করা এক অদম্য আত্মা। প্রতিবন্ধী। কিন্তু তাঁর ভেতরে এমন এক আগুন জ্বলে যে, কেউ তাঁকে ছুঁতে পারে না। দু’বার তাঁকে জোর করে টেনে-হিঁচড়ে মাটিতে ফেলা হয়েছে। শরীরে রক্তাক্ত দাগ, আত্মায় গভীর ক্ষত। তবু তিনি ভেঙে পড়েননি। বরং প্রতিবার উঠে দাঁড়িয়েছেন—চোখে জল, কণ্ঠে আগুন, বুকে অসীম সাহস নিয়ে।
আজ তাঁর এই লড়াইয়ের গল্প শুনলে কার না হৃদয় ফেটে যায়। কার না গর্বে বুক ফুলে ওঠে।
জন্ম থেকে যন্ত্রণার পথ: অটিজমের অন্ধকারে একা লড়াই
ছোটবেলা থেকেই আলিয়ার জীবন ছিল অন্ধকারের সঙ্গে যুদ্ধ। অটিজম তাঁকে প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি আলোয়, প্রতিটি ভিড়ে কষ্ট দিয়েছে। ট্রমাটিক ব্রেন ইনজুরি তাঁর শরীরকে ভঙ্গুর করে দিয়েছে। কিন্তু তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কঠিন পথ পাড়ি দিয়েছেন। আর পাশাপাশি হয়ে উঠেছেন ন্যায়ের জন্য অটল কণ্ঠস্বর। রেসিয়াল জাস্টিস, এলজিবিটিকিউ ও অধিকার, পুলিশের অত্যাচারের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। জেন্ডারকুয়ার হিসেবে নিজের পরিচয়কে বুকে ধারণ করে বলেছেন, আমি যেমন আছি, তেমনই থাকব। তাঁর চোখের কোণে লুকিয়ে থাকা প্রতিটি ফোঁটা চোখের জল আজ হাজারো প্রতিবন্ধী ভাই-বোনের চোখে আশার আলো হয়ে জ্বলছে।
জানুয়ারি ১৩: সেই হৃদয়বিদারক দিন, যেদিন মানবতা কেঁদেছিল
শুধু ডাক্তারের কাছে যাচ্ছিলেন। ৩৯তম অ্যাপয়েন্টমেন্ট। কিন্তু ‘অপারেশন মেট্রো সার্জ’-এর ট্রাফিক জ্যামে পড়ে গেলেন। আইসিই এজেন্টরা এসে জানালা ভাঙল, সিটবেল্ট কাটল, তারপর জোর করে টেনে বের করল। আলিয়া কাঁপা কাঁপা গলায়, চোখে জল নিয়ে বারবার চিৎকার করছিলেন—“আমি অটিস্টিক… আমি প্রতিবন্ধী… আমি ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি… প্লিজ, আমাকে ছেড়ে দাও!”
কিন্তু কেউ শোনেনি। হাত-পা বেঁধে মুখ নিচু করে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো। গলায় চাপ, শরীরে আঘাত, আত্মায় রক্তক্ষরণ। Whipple Federal Building-এ নিয়ে যাওয়া হলো। কোনো পরিচয় যাচাই নেই, ওষুধ নেই, সহানুভূতি নেই—শুধু নিষ্ঠুরতা। পরে হাসপাতালে ভর্তি। শরীরে কালশিটে দাগ, মনে গভীর ক্ষত। সেদিন অনেকের চোখে জল এসেছিল। আজও সেই ভিডিও দেখলে বুক ফেটে যায়।
ফেব্রুয়ারি ২৪: স্টেট অব দ্য ইউনিয়নে দ্বিতীয় আঘাত, যেদিন গণতন্ত্রের মুখোশ খসে পড়ল
ইলহান ওমারের আমন্ত্রণে স্টেট অব দ্য ইউনিয়নে গেলেন। ট্রাম্প যখন অভিবাসন নীতির কথা বলছিলেন, আলিয়া শান্তভাবে উঠে দাঁড়ালেন—নীরব প্রতিবাদ। মুহূর্তের মধ্যে ক্যাপিটল পুলিশ এসে তাঁকে টেনে-হিঁচড়ে বের করে নিল। “Unlawful Conduct” অভিযোগ। পুরোনো কাঁধের আঘাত আবার ফেটে গেল। হাসপাতালে আবার ভর্তি। কিন্তু আলিয়া ভাঙেননি। গ্রেপ্তারের পর তাঁর কথাগুলো আজও হৃদয়ে বাজে। তিনি বলেছেন “প্রতিবার আমার শরীর ভাঙার চেষ্টা করলে আমার আত্মা আরও জ্বলে ওঠে।”
কে কে তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছে
ইলহান ওমার চোখে জল নিয়ে বলেছেন, “এটি আমাদের গণতন্ত্রের জন্য লজ্জার।”, MacArthur Justice Center আইসিই-এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করছে।
Chuck Schumerসহ ডেমোক্র্যাট নেতারা, Democracy Now, Stop AAPI Hate—সবাই তাঁর পাশে। আর বাংলাদেশি–আমেরিকান ভাই-বোনেরা #JusticeForAliya ট্রেন্ড করে লাখো হৃদয় এক করেছেন।
আলিয়া, তুমি আমাদের গর্ব, আমাদের আলো, আমাদের সাহস!
আলিয়া রহমান, তুমি শুধু বেঁচে নেই—তুমি জ্বলছ। তোমার প্রতিটি আঘাত আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। তোমার সাহস দেখে হাজারো প্রতিবন্ধী ভাই-বোন আজ মাথা উঁচু করে বলতে পারছে—আমরাও পারি! তুমি একা নও। তোমার যন্ত্রণা আমাদের যন্ত্রণা, তোমার লড়াই আমাদের লড়াই।
আমি আশা করি, যুক্তরাষ্ট্র সরকার আইনি প্রক্রিয়া ও নীতি মেনে মানবিক বিচার নিশ্চিত করবে। আপনাদের সদয় মন ও নৈতিক বিবেক মানুষের উপর অযাচিত সহিংসতা ও কষ্ট কমাতে পারে। আমার এই আবেদন শুধুমাত্র আমার জন্য নয়, সকল অক্ষম ও দুর্বল মানুষের পক্ষ থেকে। আমি বিশ্বাস করি, যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার রক্ষা করে এই ঘটনার সঠিক বিচার করবে এবং ভবিষ্যতে কারও ওপর অযাচিত গ্রেপ্তার হবে না।
অঙ্গীকার, হৃদয় থেকে
আমরা সবসময় আলিয়া রহমানের পাশে থাকব। তাঁর চোখের জল, তাঁর আগুন, তাঁর সাহস—প্রতিটি মুহূর্ত তুলে ধরব। কারণ যখন একজন নারী এত বড় সাহস দেখায়, তখন গোটা বিশ্ব তাঁর পেছনে দাঁড়ায়।
আলিয়া, তুমি জয়ী হবে। তোমার আগুন কেউ নেভাতে পারবে না।
আমরা তোমার সঙ্গে আছি—হাতে হাত রেখে, হৃদয়ে হৃদয় মিলিয়ে, চোখের জলে চোখ মুছে।








