প্রত্যন্ত পাহাড়ে মাতৃভাষা বাঁচানোর লড়াই

থংপং পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও হোস্টেলে ম্রো ভাষায় শিক্ষা, প্রাথমিক ভিত্তি মজবুত করে শিক্ষার্থীদের সফলতা।
অসীম রায় (অশ্বিনী), বান্দরবান: বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ থংপং পাড়ায় ম্রো সম্প্রদায় নিজেদের মাতৃভাষা টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। জেলা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে, লামা উপজেলার রূপসী পাড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে ক্রাউডং পাহাড়ের চারপাশে বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে উঠেছে হোস্টেল ও প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে জাতীয় শিক্ষাক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ম্রো ভাষা শেখানো হচ্ছে।
২০০৯ সালে ‘রুংলে থারবা’ নামে হোস্টেলটি প্রতিষ্ঠা করেন ম্রো সম্প্রদায়ের লেখক ও গবেষক ইয়াংঙান ম্রো। নিজের শৈশবের ভাষাগত বঞ্চনার অভিজ্ঞতা থেকেই ১৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে বাঁশের বেড়ার ঘরে শুরু হয় পাঠদান। বর্তমানে এখানে ১০৭ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে জেলা পরিষদের সহায়তায় একতলা ভবন নির্মিত হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের স্বল্প খরচে থাকা-খাওয়ার সুবিধা দিচ্ছে।
হোস্টেলের পাশেই গড়ে উঠেছে থংপং পাড়া বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি মেন রন ম্রো জানান, শিক্ষার্থীদের ম্রো ভাষায় পাঠদান জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে মিলিয়ে করা হয়। এতে প্রাথমিক ভিত্তি মজবুত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা পিইসি ও এসএসসিতে ভালো ফল করছে।
ভাষাশিক্ষক মেন নং ম্রো বলেন, শিক্ষার্থীদের ম্রো ভাষার স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ শেখানো হয় নিয়মিত। এছাড়া ইয়াংঙান ম্রো’র লেখা বই পড়ানো হয় এবং দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হয়।
২০২২ সালে ম্রো সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থী সং নং ম্রো প্রথমবারের মতো এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেন। তিনি বলেন, “প্রথমে বাংলা না বুঝে স্কুলে যেতে কষ্ট হতো। নিজের ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পাওয়ায় পরে ভালো ফল করতে পেরেছি।”
বিদ্যালয়ের শিক্ষক তুম রুই ম্রো জানান, ভাষাগত পার্থক্যের কারণে অনেক সময় শিক্ষার্থীরা পাঠ বুঝতে পারে না, বিশেষত যখন শিক্ষক অন্য সম্প্রদায়ের হন। মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করলে শিশুর শেখার আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস দুইই বৃদ্ধি পায়।
জেলা পরিষদ সূত্র জানায়, এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার ম্রো সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে নিরক্ষরতার হার এখনও উচ্চ। তবে স্থানীয় উদ্যোগে বর্ণমালা শেখানো ও বই প্রকাশের কাজ চলছে। সরকারি পর্যায়ে ম্রো বর্ণমালায় পাঠ্যপুস্তক প্রকাশ ও শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
দুর্গম পাহাড়ি পাড়ায় সীমিত সম্পদ নিয়েও মাতৃভাষা রক্ষার এই প্রয়াস স্থানীয়দের কাছে শুধু শিক্ষা নয়—আত্মপরিচয় রক্ষার সংগ্রাম।






