আদানি চুক্তিতে ক্ষতি ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা: পুনর্মূল্যায়ন শুরু

দায়িত্বের তৃতীয় দিনেই আদানি চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন শুরু। মূল্য কাঠামো, দুর্নীতি অভিযোগ ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক।

টুইট প্রতি‌বেদক: দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র তৃতীয় দিনেই বিতর্কিত আদানি বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তি পুনর্মূল্যায়নের প্রক্রিয়া শুরু করেছে নতুন সরকার। সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীসহ চারজন মন্ত্রী অংশ নেন।

বৈঠকে চুক্তির আর্থিক কাঠামো, মূল্য নির্ধারণ প্রক্রিয়া, সম্ভাব্য প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে বিস্তারিত আলোচনা হয়। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি; তবে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়ে চুক্তিটি সতর্কতার সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোদ্দায় স্থাপিত ১৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য Adani Power Limited-এর সঙ্গে ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (PPA) স্বাক্ষরিত হয়। ওই কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে ১৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণ করে।

গত ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (NRC) তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে চুক্তিটিতে ব্যাপক অনিয়ম, অতিমূল্যায়ন এবং দুর্নীতির প্রমাণ থাকার দাবি করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম অন্যান্য ভারতীয় উৎসের তুলনায় ৪-৫ সেন্ট বেশি, যা প্রায় ৫০ শতাংশ অধিক। এর ফলে বাংলাদেশকে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৪০০-৫০০ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৫,৫০০-৬,০০০ কোটি টাকা) ব্যয় করতে হচ্ছে।

২৫ বছরে সম্ভাব্য মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।

২০২৫ সালের মধ্যে ইউনিটপ্রতি দাম ১৪.৮৭ সেন্টে পৌঁছানোর আশঙ্কাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, ৭-৮ জন ব্যক্তি—যাদের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তাও রয়েছেন—কয়েক মিলিয়ন ডলারের অবৈধ লেনদেনে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিদেশি ব্যাংক হিসাব, সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেনের তারিখ, বেনিফিশিয়ারি তথ্য, ভ্রমণ রেকর্ডসহ বিভিন্ন দলিল তাদের হাতে রয়েছে বলে দাবি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো উন্মুক্ত টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সরাসরি চুক্তি করা হয় এবং মূল্য নির্ধারণে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের সুযোগ দেওয়া হয়নি। আরও বলা হয়, মূল্য নির্ধারণে এস আলম গ্রুপ-এর একটি ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ চুক্তিকে বেঞ্চমার্ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা নিজেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল। গোদ্দা প্ল্যান্টের স্থান নির্বাচন ও ঝুঁকি বণ্টনেও বাংলাদেশকে অসামঞ্জস্যপূর্ণ দায়ভার নিতে হয়েছে—ভারতীয় কর্পোরেট কর, কয়লার অতিরিক্ত মূল্য এবং রাজনৈতিক ও মুদ্রা ঝুঁকির বোঝা বাংলাদেশকেই বহন করতে হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর মুশতাক হোসেন খান কমিটির সদস্য হিসেবে মন্তব্য করেন, “এ ধরনের চুক্তি শুধুমাত্র দুর্নীতির মাধ্যমেই সম্ভব; অন্য কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা নেই।” যুক্তরাজ্যভিত্তিক 3VB Chambers-এর কিংস কাউন্সেলের আইনি দল পর্যালোচনায় bribery ও fraud-এর জন্য যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে বলে মত দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রমাণ ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনে (ACC) পাঠানো হয়েছে।

কমিটি সুপারিশ করেছে, সিঙ্গাপুর ইন্টারন্যাশনাল আরবিট্রেশন সেন্টার (SIAC)-এ মামলা করে চুক্তি বাতিল বা পুনর্বিবেচনার উদ্যোগ নেওয়া উচিত। বিলম্ব হলে বাংলাদেশের আইনি অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

অন্যদিকে Adani Power Limited দাবি করেছে, তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি এবং তারা নিয়মিতভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, যদিও কিছু বকেয়া রয়েছে।

বর্তমানে নতুন সরকার নিজস্ব মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো আর্থিক, আইনি ও কৌশলগত দিক থেকে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করছে।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো শর্ত থাকলে তা সংশোধন বা পুনর্বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।