রক্তে লেখা একুশ: ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন—রাষ্ট্রচিন্তা, জাতিসত্তা ও আত্মমর্যাদার নির্মাণ।

ব‌দিউল আলম লিংকন: ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি দিন নয়—এটি রাষ্ট্রক্ষমতার একরৈখিক ভাষানীতির বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক বিস্ফোরণ। ঢাকার রাজপথে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের মধ্য দিয়ে যে রক্তপাত ঘটেছিল, তা পরিণত হয়েছিল এক গভীর রাজনৈতিক জাগরণে।

শহীদ আবুল বরকত, আব্দুল জব্বার, রফিক উদ্দিন আহমদ, আব্দুস সালাম এবং পরদিন শফিউর রহমান–এর আত্মদান বাঙালির জাতিসত্তা নির্মাণের ইতিহাসে এক অনিবার্য মোড় তৈরি করে।

রাষ্ট্রভাষা বিতর্ক: সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা, সংখ্যালঘুর সিদ্ধান্ত

১৯৪৭-এ ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠিত হয়। পূর্বাংশে (পূর্ববঙ্গ) ছিল দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ জনগোষ্ঠী, যাদের মাতৃভাষা বাংলা। তবু পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক শাসকগোষ্ঠী উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার নীতি গ্রহণ করে।

১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ ঢাকায় এসে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঘোষণা দেন,

“উর্দু এবং কেবল উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।”

এই ঘোষণা ছিল কেবল ভাষানীতির প্রশ্ন নয়; এটি ছিল ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ।

ভাষা-আন্দোলনের সূচনাপর্বে তমদ্দুন মজলিস, ছাত্রসমাজ এবং বুদ্ধিজীবীরা সাংগঠনিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ প্রথম সর্বাত্মক ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের পুনরায় উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর পরিস্থিতি চূড়ান্ত রূপ নেয়।

১৪৪ ধারা ভঙ্গ: নাগরিক অধিকার বনাম ঔপনিবেশিক মানসিকতা

২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে। এটি ছিল রাজনৈতিক প্রতিবাদ দমনের প্রশাসনিক কৌশল।

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্ররা সমবেত হয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নেয়—আইন অমান্য করেই মিছিল বের হবে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা চরমে ওঠে। লাঠিচার্জ, টিয়ার গ্যাসের পর বিকেলে মেডিকেল কলেজের সামনে পুলিশ গুলি চালায়।

এই গুলিবর্ষণ ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের নৈতিক পরাজয়ের সূচনা। ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান বরকত, রফিক, জব্বার, সালাম। পরদিন শফিউর রহমান শহীদ হন। সরকারি হিসাব কমিয়ে দেখানো হলেও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি ছিল।

ভাষা থেকে জাতীয়তাবাদ: রাজনীতির রূপান্তর

১৯৫২-এর আন্দোলন ছিল পাকিস্তানি রাষ্ট্রের কাঠামোগত বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রথম সর্বজনীন গণপ্রতিরোধ। এর মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে ভাষা ও সংস্কৃতিভিত্তিক আত্মপরিচয়ে রূপ নেয়।

এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের বিজয় ঘটে এবং ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা উর্দুর পাশাপাশি রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পায়। কিন্তু বৈষম্যের অবসান হয়নি; বরং ভাষা-আন্দোলন হয়ে ওঠে ১৯৬৬-এর ছয় দফা, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান এবং ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের বীজতলা।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: একুশ থেকে বিশ্বমঞ্চ

ভাষার জন্য আত্মদান বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ১৯৯৯ সালে UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে—যা কার্যকর হয় ২০০০ সাল থেকে। এর মাধ্যমে একুশের চেতনা জাতীয় সীমানা অতিক্রম করে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রতীক হয়ে ওঠে।

আজ বিশ্বের নানা প্রান্তে ভাষাগত বৈচিত্র্য রক্ষার আন্দোলনে একুশ অনুপ্রেরণা জোগায়। ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়—এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের ধারক।

শহীদ মিনার: স্মৃতির স্থাপত্য, প্রতিবাদের প্রতীক

২১ ফেব্রুয়ারির রাতেই ছাত্ররা অস্থায়ী শহীদ মিনার নির্মাণ করে। বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সেই প্রতিরোধের স্থাপত্যরূপ। প্রতি বছর প্রভাতফেরি, কালো ব্যাজ, আর “আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি” গানের সুরে জাতি স্মরণ করে আত্মমর্যাদার সেই লাল অধ্যায়।
উপসংহার: রাষ্ট্রচিন্তার পুনর্গঠন
১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন ছিল সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নে এক গণজাগরণ। এটি প্রমাণ করে—রাষ্ট্র যদি জনগণের সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে, তবে প্রতিরোধ অবশ্যম্ভাবী।
রক্তে লেখা একুশ আমাদের শেখায়—ভাষা মানে পরিচয়, ভাষা মানে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। আর আত্মমর্যাদা রক্ষায় বাঙালি জাতি কখনও আপস করে না।