সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বাতিল

মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট ট্রাম্পের বৈশ্বিক শুল্ক নীতির বিস্তৃত অংশ খারিজ করে দিয়েছে: অর্থনৈতিক এজেন্ডায় বড় ধাক্কা।

বিশেষ প্রতিবেদন: যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট আজ শুক্রবার এক ঐতিহাসিক রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে আরোপিত বিশ্বব্যাপী শুল্কের একটি বড় অংশ অবৈধ ঘোষণা করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই রায় ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” অর্থনৈতিক এজেন্ডায় বড় আইনি ও রাজনৈতিক ধাক্কা।

কনজারভেটিভ-সংখ্যাগরিষ্ঠ আদালত ৬-৩ ভোটে রায় দিয়ে স্পষ্ট করে বলেছে, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন (International Emergency Economic Powers Act বা IEEPA) প্রেসিডেন্টকে শুল্ক বা কর আরোপের কোনো অধিকার দেয় না। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস রায় প্রদানকালে উল্লেখ করেন, “IEEPA আইনে শুল্ক বা করের কোনো উল্লেখই নেই। কংগ্রেস যদি প্রেসিডেন্টকে এমন অসাধারণ ক্ষমতা দিতে চাইত, তাহলে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করত—যেমনটি অন্যান্য শুল্ক-সংক্রান্ত আইনে করা হয়েছে।”

গত বছর ২০২৫ দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প প্রশাসন IEEPA-এর আওতায় প্রায় সব প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর “পারস্পরিক” (reciprocal) শুল্ক আরোপ করে। এর মধ্যে ছিল মেক্সিকো, কানাডা ও চীনের ওপর অবৈধ মাদক ও অভিবাসন সংক্রান্ত অজুহাতে অতিরিক্ত শুল্ক। এই পদক্ষেপগুলো বিশ্ব বাণিজ্যকে ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত করেছিল।
নিম্ন আদালত গত মে মাসে এই শুল্কগুলোকে অবৈধ ঘোষণা করে বাস্তবায়ন স্থগিত রাখার নির্দেশ দিয়েছিল।সরকারের আপিলের কারণে সেই রায় স্থগিত ছিল। আজ সুপ্রিম কোর্ট সেই নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্তই বহাল রেখেছে। তিনজন লিবারেল বিচারপতি ও তিনজন কনজারভেটিভ বিচারপতি সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রায় দেন। বিচারপতি ব্রেট কাভানাফ, ক্ল্যারেন্স থমাস ও স্যামুয়েল আলিটো ভিন্নমত পোষণ করেন।

অর্থনৈতিক পরিণতি

EY-Parthenon-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ড্যাকো বলেন, এই রায়ের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্কের হার ১৬.৮ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৯.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন যে এটি সাময়িক হতে পারে—প্রশাসন অন্য আইনি পথ খুঁজে নতুন করে শুল্ক আরোপের চেষ্টা করবে।

সরকারের রাজস্বের দিক থেকেও বড় ধাক্কা। ড্যাকোর হিসাব অনুসারে, বছরে ১০০ থেকে ১২০ বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব হারাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। আমদানিকারকদের শুল্ক ফেরত প্রক্রিয়া কতটা জটিল হবে তা আদালত স্পষ্ট করেনি। বিচারপতি কাভানাফ মৌখিক শুনানিতে এ প্রক্রিয়াকে “একটা বিশৃঙ্খলা” বলে উল্লেখ করেছিলেন।

আইনি ও নীতি

ট্যাক্স ফাউন্ডেশনের বাণিজ্য নীতি বিশেষজ্ঞ এরিকা ইয়র্ক বলেন, “এই রায় প্রেসিডেন্টের ইচ্ছামতো সর্বব্যাপী শুল্ক আরোপের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সীমিত করবে।” তবে ট্রাম্প প্রশাসনের হাতে এখনও অন্যান্য আইনি পথ খোলা রয়েছে—যেমন ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়ামসহ বিভিন্ন পণ্যের জন্য খাতভিত্তিক শুল্ক (sector-specific tariffs)। সরকারি তদন্ত চলমান রয়েছে যা ভবিষ্যতে আরও এমন শুল্কের দরজা খুলতে পারে।

বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া ও সম্ভাব্য পরিণতি

এই রায় বিশ্ববাণিজ্যের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বাণিজ্যিক অংশীদাররা এখন কিছুটা স্বস্তি পাবে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন দ্রুত বিকল্প পথ খুঁজবে—হয়তো নতুন আইনি তদন্ত বা কংগ্রেসের সহায়তায়।

এই রায় ট্রাম্পের “আমেরিকা ফার্স্ট” অর্থনৈতিক দর্শনের জন্য একটি বড় আইনি ও রাজনৈতিক ধাক্কা। এটি প্রমাণ করে যে, এমনকি কনজারভেটিভ-সংখ্যাগরিষ্ঠ আদালতও প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার সীমা অতিক্রম সহ্য করবে না।

সূত্র: প্রতিবেদনটি এএফপি’র মূল সংবাদের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে।