রমজানের আগেই বাজারে আগুন

ছবি: সংগৃহিত

খেজুর, ফল ও সবজির দামে অস্বাভাবিক উল্লম্ফন, ভোক্তাদের উদ্বেগ।

টুইট প্রতিবেদক: পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে খেজুর, ফলমূল, কাঁচামরিচ, লেবু, শসা ও কলার মতো রমজানে বেশি ব্যবহৃত পণ্যের দাম গত কয়েকদিনে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সরবরাহে বিঘ্ন, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, এবং বাজার তদারকির ঘাটতির কারণে এই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খেজুর ও ফলের দামে বড় লাফ

রমজানে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পণ্য খেজুরের দাম এবার সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। গত বছর জাহিদি খেজুর যেখানে প্রতি কেজি ১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল, সেখানে এখন তা ২৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অন্যান্য খেজুরের দামও চড়া—বরই খেজুর ৪৮০–৫০০ টাকা, কালমি ৬০০–৭০০ টাকা, মাবরুম ৮৫০–১,২০০ টাকা এবং মেডজুল খেজুর ১,২০০–১,৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।

ফলের বাজারেও একই চিত্র। রাজধানীর বাবুবাজার, নয়াবাজার ও কারওয়ানবাজারে আপেল ২৬০–৪৫০ টাকা, কমলা ৩০০–৩৮০ টাকা, মাল্টা ২৫০–৩০০ টাকা, আঙুর ৫২০–৬০০ টাকা এবং আনার ৪৫০–৬৫০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। আমদানি করা ফলের দাম কেজিতে ২০ থেকে ৬০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

সবজি ও অন্যান্য পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী

শুধু ফল নয়, নিত্যব্যবহৃত সবজি ও অন্যান্য পণ্যের দামও বেড়েছে। কাঁচামরিচের দাম গত সপ্তাহের তুলনায় কেজিতে প্রায় ৪০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকায় পৌঁছেছে। কলার দাম তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে হালি ৫০–৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগে ছিল ২০ টাকা। শসা ৭০–১০০ টাকা এবং লেবু হালি ৫০–১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

মূল্যবৃদ্ধির পেছনে সরবরাহ সংকট ও আন্তর্জাতিক বাজার

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি এবং চট্টগ্রাম বন্দরের অস্থিরতার কারণে খেজুরসহ আমদানি করা পণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি গত কয়েকদিন পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

তবে ভোক্তা সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, “রমজান এলেই সিন্ডিকেট, মজুতদারি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর সরকারি মনিটরিং না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছে।”

আমদানি বাড়লেও কমেনি দাম

চলতি অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ৩৭ হাজার ৯৩১ টন খেজুর আমদানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৫ হাজার টন বেশি। অথচ আমদানি বাড়লেও বাজারে দাম কমেনি, যা ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যানুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৯০–৯৫ হাজার টন খেজুরের চাহিদা রয়েছে, যার প্রায় ৭০ শতাংশ বিক্রি হয় রমজান মাসে।

কিছু পণ্যে স্বস্তি, তবুও উদ্বেগ কাটছে না

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় ছোলা, চিনি এবং খোলা সয়াবিন তেলের দাম কিছুটা কম রয়েছে। তবে বাজারে অধিকাংশ পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের জন্য নতুন করে চাপ সৃষ্টি করছে।

বাজার স্থিতিশীল রাখতে সতর্কবার্তা

রমজানকে সামনে রেখে এফবিসিসিআই জানিয়েছে, দেশে ভোজ্যতেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজসহ প্রয়োজনীয় পণ্যের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে মূল্যবৃদ্ধির সুযোগ নেই বলেও তারা মনে করছে। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাঁদাবাজি বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং অপ্রয়োজনীয় পণ্য মজুত না করার জন্য ভোক্তাদের অনুরোধ করা হয়েছে।

রমজানের আগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার এই প্রবণতা নতুন নয়। তবে এবারও একই পরিস্থিতি দেখা দেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর মনিটরিং ও কঠোর পদক্ষেপই পারে ভোক্তাদের স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।