চিকেন্স নেক ও আসামে কেন সুড়ঙ্গ বানাচ্ছে ভারত

ছবি: সংগৃহিত

চিকেন্স নেকে ভূগর্ভস্থ রেলপথের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে

বিশ্ব ডেস্ক: ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা মাত্র ২০–২৫ কিলোমিটার চওড়া সরু ভূখণ্ড—চিকেন্স নেক বা শিলিগুড়ি করিডর নতুন করে কৌশলগত আলোচনার কেন্দ্রে। উত্তরে নেপাল ও ভুটান–তিব্বতের চুম্বি উপত্যকা, দক্ষিণে বাংলাদেশ—এমন সংবেদনশীল ভৌগোলিক অবস্থান এই করিডরকে ভারতের জন্য কার্যত ‘রেড লাইন’ বানিয়েছে।

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চুম্বি ভ্যালি থেকে দ্রুত অগ্রসর হলে উত্তর-পূর্বের আট রাজ্য (আসাম, অরুণাচলসহ) মূল ভারতের সঙ্গে স্থল যোগাযোগ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

২০১৭ সালে ডোকলাম–এ ভারত-চীন মুখোমুখি অবস্থান (ডোকলাম স্ট্যান্ডঅফ) করিডরের ভঙ্গুরতাকে সামনে আনে। তিব্বতের Chumbi Valley থেকে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে বেইজিং যে কৌশলগত বার্তা দিয়েছিল, তা নয়াদিল্লির কাছে ছিল সতর্কবার্তা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় সড়ক, এয়ারস্ট্রিপ ও লজিস্টিক অবকাঠামো জোরদার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড–ঘনিষ্ঠ প্রকল্প সম্প্রসারণকে ভারত ‘এনসার্কেলমেন্ট’ কৌশল হিসেবে বিবেচনা করছে—যার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শিলিগুড়ি করিডরে।

করিডর সুরক্ষায় ভারত একাধিক স্তরে প্রস্তুতি নিচ্ছে। আকাশ প্রতিরক্ষায় রুশ নির্মিত S-400 মোতায়েনের পাশাপাশি স্থল যোগাযোগকে ক্ষেপণাস্ত্র–সহনশীল করতে ভূগর্ভস্থ রেল অবকাঠামো পরিকল্পনা এগিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের তিন মাইল হাট থেকে শিলিগুড়ি হয়ে রাঙাপাণি পর্যন্ত প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথে রেললাইন বসানোর প্রস্তাব চূড়ান্ত পর্যায়ে। উত্তর পূর্ব রেলওয়ের মুখপাত্র কপিলাঞ্জল কিশোর শর্মা জানিয়েছেন, প্রকল্প প্রস্তুত—চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষা। রেলমন্ত্রী Ashwini Vaishnawও পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূগর্ভস্থ রেলপথ সামরিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিকেই গেম-চেঞ্জার। আকাশ হামলা বা দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের ঝুঁকি থাকলেও যোগাযোগ সচল রাখা যাবে। সেনা ও রসদ দ্রুত সরানো সম্ভব হবে; বেসামরিক পণ্য পরিবহনও কম ব্যাহত হবে।

উত্তর-পূর্বে বিকল্প ও দ্রুত সংযোগ তৈরির অংশ হিসেবে আসামে ব্রহ্মপুত্র নদের তলায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ দ্বৈত (টুইন-টিউব) রেল–সড়ক সুড়ঙ্গের অনুমোদন দিয়েছে ভারত সরকার। গোহপুর থেকে নুমালিগড় সংযোগকারী এ প্রকল্পে এক টিউবে ট্রেন, অন্যটিতে গাড়ি চলবে; ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১৮,৬৬২ কোটি টাকা। যাতায়াত সময় ৬ ঘণ্টা থেকে নেমে ২০ মিনিটে আসার লক্ষ্য—এটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের প্রথম এমন আন্ডারওয়াটার রেল–সড়ক সুড়ঙ্গ হবে।

আঞ্চলিক প্রেক্ষাপট ও উদ্বেগ

করিডরের দক্ষিণে বাংলাদেশের অবস্থান এবং উত্তরে নেপাল–ভুটান–তিব্বত সংযোগ অঞ্চল এটিকে বহুমাত্রিক ভূকৌশলগত স্পেসে পরিণত করেছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে চীনা অবকাঠামো সম্প্রসারণ নিয়ে ভারতের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। সীমান্তঘেঁষা এলাকায় সম্ভাব্য সামরিক সুবিধা—এমন যেকোনো খবর নয়াদিল্লিতে সতর্কতা বাড়ায়।

কেন ‘রেড লাইন’?

চিকেন্স নেক কেবল একটি সরু ভূখণ্ড নয়; এটি ভারতের উত্তর-পূর্বের অর্থনীতি, জ্বালানি, চা–তেল–গ্যাস সরবরাহ শৃঙ্খল, এবং সেনা মোতায়েনের লাইফলাইন। সামান্য সময়ের জন্যও যদি এই করিডর অকার্যকর হয়, তার প্রভাব সামরিকের বাইরে গিয়ে জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়বে। ফলে অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ, আকাশ প্রতিরক্ষা, বহুমুখী সংযোগ এবং কূটনৈতিক তৎপরতা—সব মিলিয়ে করিডর রক্ষায় সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে ভারত।

ডোকলামের অভিজ্ঞতা ও চুম্বি উপত্যকার নৈকট্য শিলিগুড়ি করিডরকে স্থায়ী কৌশলগত সতর্কতায় রেখেছে। সুড়ঙ্গ–রেল ও ব্রহ্মপুত্রের নিচে দ্বৈত টানেল—এই প্রকল্পগুলো কেবল উন্নয়ন নয়; সম্ভাব্য সংকটেও যোগাযোগ অটুট রাখার সামরিক–অর্থনৈতিক বীমা। এজন্যই চিকেন্স নেক আজ ভারতের অঘোষিত ‘রেড লাইন’।