ঝাড়ু ফুল সংগ্রহে ভোর থেকে সন্ধ্যা, কষ্টেই টিকে আছে শত পরিবার

দুর্গম পাহাড় পেরিয়ে জীবিকার সন্ধানে পাহাড়ি নারীরা।

অসীম রায় (অশ্বিনী), বান্দরবান প্রতিনিধি: ভোরের আলো ফুটতেই বান্দরবান–এর কানা পাহাড়ে শুরু হয় পাহাড়ি নারীদের ব্যস্ততা। হাতে দা, পিঠে বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে দুর্গম পাহাড় বেয়ে তারা খুঁজে ফেরেন প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ঝাড়ু ফুল। কখনো খাড়া পাহাড়, কখনো গহীন জঙ্গলপথ—ঝুঁকি আর কষ্ট সঙ্গী করেই সংগ্রহ করা এই ঝাড়ু ফুলই তাদের জীবিকার অন্যতম ভরসা।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ঝাড়ু ফুল সংগ্রহ মৌসুমি পেশা হলেও বহু পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস এটি। সংগৃহীত ফুল বিক্রি করে চাল, ডাল, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা হয়; মেটানো হয় সন্তানদের পড়াশোনার খরচও। তবে দুর্গম পাহাড়ে যেতে গিয়ে বন্যপ্রাণীর ভয়, দুর্ঘটনা এবং শারীরিক ঝুঁকির মুখে পড়তে হয় নিয়মিত।

হাটে পাহাড়ের প্রতিচ্ছবি

রোববার ও বুধবার বান্দরবানের হাটবাজারে গেলে দেখা যায় সেই পাহাড়েরই প্রতিচ্ছবি। সারি সারি ঝাড়ু ফুলের আটি সাজিয়ে বসেন পাহাড়ি নারী-পুরুষ। কারও কাঁধে ঝুড়ি, কারও পাশে বাঁধা ঝাড়ুর আঁটি—ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষিতে মুখর থাকে বাজার।

স্থানীয়রা জানান, একটি ঝাড়ু ফুলের কাঠি বিক্রি হয় ১ টাকা দরে। ১২টি কাঠি দিয়ে তৈরি হয় এক আটি, যার দাম ১২ টাকা। সাধারণত ২০ থেকে ৩০টি শলাকা দিয়ে একটি ঝাড়ুর আটি বাঁধা হয়; আকার ও মানভেদে প্রতিটি আটি ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হয়। বাজারে এই পণ্যের সামগ্রিক লেনদেন প্রায় ১০ কোটি টাকার বলে ব্যবসায়ীরা দাবি করেন।

তিন পাহাড় ঘেঁষা বিস্তীর্ণ এলাকা ছাড়াও বাঘমারা ও জেলার সাতটি উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় নারীরা ঝাড়ু ফুল সংগ্রহ করেন। দিনের পর দিন পাহাড়ে ঘুরে ফুল সংগ্রহ করা সহজ নয়। সংগ্রহ করা ফুল সাধারণত হোন্ডাযোগে বাজারে আনা হয়।

বান্দরবান হাটে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে আসা পাইকাররা এসব ফুল কিনে নেন। পরে ‘চাঁদের গাড়ি’সহ বিভিন্ন পরিবহনে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে রোদে শুকানো হয়। শুকানোর পর ঝাড়ু বেঁধে দেশের বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করা হয়।

একটি বান্ডিলে সাধারণত ৫০ থেকে ১০০টি আটি থাকে। মানভেদে প্রতিটি বান্ডিলের দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। পাইকারি ও খুচরা বাজারে হাত বদলের সঙ্গে সঙ্গে দাম বেড়ে কখনো কখনো একটি ঝাড়ুর মূল্য ১০০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছে যায়।

পাহাড়ি নারীদের কণ্ঠে সংগ্রামের গল্প

কানা পাহাড় এলাকার পাহাড়ি নারী রুনা ত্রিপুরা বলেন, “ভোরের আলো ফোটার আগেই আমরা ঘর থেকে বের হই। পাহাড়ের ভেতরে ঢুকে দুপুর গড়িয়ে যায়, তবুও কাজ থামে না। মাঘের শীত হোক বা ঝাঁঝালো রোদ—কিছুই আমাদের থামাতে পারে না। ঝাড়ু ফুল বিক্রি করেই চাল-ডাল কিনি; এই আয়ের ওপরই পরিবার টিকে আছে।”

একই এলাকার ডলি মারমা জানান, “আমাদের এলাকায় সারা বছর কাজের সুযোগ নেই। তাই ঝাড়ু ফুল সংগ্রহই প্রধান ভরসা। কষ্ট অনেক, শরীর ভেঙে আসে; তবু নিজের পরিশ্রমে টাকা হাতে পাওয়ার অনুভূতিই শক্তি দেয়।”

সুমি চাকমা বলেন, “নারী হয়েও প্রতিদিন ভারী বোঝা কাঁধে নিয়ে দুর্গম পথ পেরোই। এই আয় দিয়েই ছেলেমেয়েদের স্কুলের বেতন, খাতা-কলম কিনি। সরকার যদি সহজ পরিবহন, ন্যায্যমূল্য বা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করত, জীবন অনেক সহজ হতো।”

সম্ভাবনার কথা বলছেন কৃষি কর্মকর্তা

উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মুনমুন বিশ্বাস বলেন, “ঝাড়ু ফুল পাহাড়ি অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এটি চাষাবাদের আওতায় আনা গেলে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর আয় আরও বাড়বে। পরিকল্পিতভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা গেলে পরিবেশের ক্ষতি না করেই দীর্ঘমেয়াদি সুফল পাওয়া সম্ভব।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি সহযোগিতা, সহজ পরিবহন ব্যবস্থা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে ঝাড়ু ফুল পাহাড়ি অর্থনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তাই কানা পাহাড়ের ঝাড়ু ফুল শুধু একটি পণ্য নয়—এটি পাহাড়ি নারীদের শ্রম, সাহস ও টিকে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক।