১৪৪ ধারা জারি থাকলেও দুর্গাপুরে থামছে না অবৈধ পুকুর খনন

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে অব্যাহত রয়েছে অবৈধ পুকুর খনন। কোনো ধরনের সরকারি অনুমোদন ছাড়াই তিন ফসলি কৃষিজমিতে গভীর পুকুর কেটে সেই মাটি প্রকাশ্যে বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট ফসলি জমি দখল করে দীর্ঘদিন ধরে এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
জানা গেছে, পুকুর খনন বন্ধে গত ১ ফেব্রুয়ারি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ১৪৪ ধারা জারি করেন। কিন্তু আদেশ কার্যকর হয়নি। পরে ১০ ফেব্রুয়ারি এক চিঠিতে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। তবুও খনন কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের দাপটে প্রশাসন কার্যত নীরব দর্শকের ভূমিকায় রয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে হুমকি, ভয়ভীতি ও মিথ্যা মামলার আশঙ্কা দেখানো হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দিনের বেলায় কার্যক্রম সীমিত থাকলেও রাত হলেই ভারী যন্ত্রপাতি- বিশেষ করে এক্সকাভেটর নিয়ে শুরু হয় মাটি কাটার কাজ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাতের অন্ধকারকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে প্রশাসনের নজরদারি এড়িয়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
উপজেলার কিসমতগণকৈড় ইউনিয়নের বড়াইল পালাসপাড়া বিলে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করছেন গণকৈড় গ্রামের মফিজ সরকারের ছেলে হান্নান সরকার ও বড়ইল গ্রামের এছামুদ্দিন মণ্ডলের ছেলে আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডল- এমন অভিযোগ স্থানীয়দের। এছাড়া সিরাজগঞ্জে কর্মরত এক ব্যক্তি নিজেকে ডিবি পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে রাতুগ্রাম বিলে প্রায় ৫০ বিঘা জমিতে পুকুর খনন করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে ৭ নম্বর জয়নগর ইউনিয়নের আনুলিয়া বিলে দুই স্থানে অবৈধ পুকুর খনন চলছে। এলাকাবাসীর দাবি, ছলিম ও এরশাদের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সেখানে ইতোমধ্যে প্রায় ১৭৬ বিঘা জমি খনন করেছে।
আইন অনুযায়ী কৃষিজমিতে পুকুর খননের জন্য প্রশাসনের লিখিত অনুমোদন ও নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ বাধ্যতামূলক। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে তার কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অতিরিক্ত গভীর খননের ফলে শুষ্ক মৌসুমেই আশপাশের জমিতে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে। কৃষকদের আশঙ্কা, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পুরো এলাকার কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়তে পারে।
পুকুরের মাটি পরিবহনের জন্য ভারী ট্রলি ও ট্রাক চলাচলে কাঁচা ও পাকা সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে ভ্যানচালক মান্নান বলেন, ভারী যানবাহনের চাপে সড়কে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে; সামান্য বৃষ্টিতেই চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় কৃষক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, “তিন ফসলি জমিতে পুকুর খনন মানেই কৃষির ধ্বংস। রাতভর মাটি কাটার ফলে ধুলাবালিতে রসুন, পেঁয়াজ, মসুরসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বারবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না।”
অভিযোগের বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, পুকুর খননের বিষয়টি ভূমি সংক্রান্ত; এ বিষয়ে এসিল্যান্ড ও ইউএনও ব্যবস্থা নেন। ভ্রাম্যমাণ অভিযানে প্রয়োজন হলে পুলিশ সহযোগিতা করে।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) লায়লা নূর তানজুর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা বলেন, “মৌখিক বা লিখিত কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। লোক পাঠানো হয়েছিল, কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপরও যদি খনন অব্যাহত থাকে, আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অবিলম্বে অবৈধ পুকুর খনন ও মাটি পরিবহন বন্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তা না হলে দুর্গাপুরের তিন ফসলি জমি, কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।






