বিদ্রোহী, যুবভোট ও গ্রাম–শহর বিভাজনে অনিশ্চিত সমীকরণ: সাধু সাবধান

দ্বিমুখী লড়াইয়ে নতুন হিসাব-নিকাশ
বদিউল আলম লিংকন: বাংলাদেশের ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনার সরকারের পতন এবং আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ার পর এটি প্রথম প্রতিযোগিতামূলক জাতীয় নির্বাচন।
মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামী-নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের (যার মধ্যে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা NCP অন্তর্ভুক্ত) মধ্যে।
এটি নির্বাচনের ঠিক আগের দিন (১১ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত সাম্প্রতিক নিরপেক্ষ জরিপ, মিডিয়া রিপোর্ট এবং মাঠের পরিস্থিতি থেকে একটি সিনিয়র লেভেলের বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন।
নির্বাচনটি ৩০০ আসনের জন্য অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যেখানে বিএনপি ২৮৮-২৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে এবং জামায়াত জোট প্রায় ২২০-২৫০টিতে। এটি একটি দ্বিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা (bipolar contest) হিসেবে চিহ্নিত, যেখানে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বিএনপি ও জামায়াত জোটের মধ্যে ভোটের পুনর্বণ্টন ঘটিয়েছে। (সূত্র: Wikipedia – 2026 Bangladeshi general election; Al Jazeera – Bangladesh 2026 elections explained in maps and charts, 9 Feb 2026)।
বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং বিদ্রোহী প্রার্থীরা দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রথম আলোর রিপোর্ট অনুসারে, ৭৯টি আসনে ৯২ জন বিএনপি নেতা স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন, যার মধ্যে ৪৬+ আসনে তারা শক্ত অবস্থানে। এতে দলীয় প্রার্থীদের ভোট ভাগ হচ্ছে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও মিশ্র আসনে (পাবনা, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল বিভাগ)।
মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের অভিমান থেকে অনেকে দলের অফিসিয়াল প্রার্থীকে সমর্থন না করে বিপক্ষে ভোট দেওয়া বা নিরপেক্ষ থাকার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কুমিল্লা, নোয়াখালী, টাঙ্গাইল, যশোর ইত্যাদি আসনে বিক্ষোভ ও কমেন্টসে “জামায়াতকে ভোট দিব” এমন মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। এই ভোট বিভাজন জামায়াত জোটকে সরাসরি লাভ দিচ্ছে। (সূত্র: Prothom Alo – BNP’s 92 ‘rebel’ candidates in 79 constituencies, 20 Jan 2026; Prothom Alo – ‘Rebel candidates’ emerge as BNP’s biggest challenge, 30 Jan 2026; The Business Standard – BNP, allies under pressure from rebel candidates in 46 constituencies, 31 Jan 2026)।
চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির অভিযোগ বিএনপির ইমেজ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ২০২৪-এর আন্দোলনের পর বিএনপির গ্রাসরুট নেতা/কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, লুটপাট, সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে (যেমন: পঞ্চগড়ে NCP প্রার্থী সারজিস আলমের অভিযোগ)।
জনমত জরিপে দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা শীর্ষ সমস্যা (৫২-৬৭% ভোটার)। যুবকরা (Gen Z) বিএনপিকে “চাঁদাবাজির দল” মনে করছে। জামায়াত এটিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের “দুর্নীতিমুক্ত” ও “জনকল্যাণমুখী” হিসেবে প্রচার করছে—অ্যাপ দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ নেওয়া, অ্যান্টি-করাপশন প্রতিশ্রুতি। এতে গ্রামীণ ও যুব ভোটারদের মধ্যে জামায়াত লাভবান। (সূত্র: Various reports from Prothom Alo, Daily Star; Al Jazeera – What is Bangladesh’s Jamaat-e-Islami party?, 21 Jan 2026)।
জামায়াতের গ্রামীণ শক্তি ও ক্যাডার-ভিত্তিক সংগঠন (ছাত্রশিবিরসহ) অত্যন্ত শক্তিশালী। IILD জরিপ অনুসারে গ্রামে জামায়াত এগিয়ে, শহরে বিএনপি। দরজায় দরজায় প্রচার ও ঐক্যবদ্ধতা জামায়াতের “নিশ্চিত জয়” বাড়িয়েছে। যুব ও নতুন ভোটারদের আকর্ষণও উল্লেখযোগ্য—২০০৮-এর পর প্রথম ভোটারদের মধ্যে ৩৭.৪% সমর্থন, NCP-এর মাধ্যমে যুবকদের ১৭%+ সমর্থন। আওয়ামী লীগের পুরনো ভোটারদের ~৩০% জামায়াতে যাচ্ছে। (সূত্র: IILD survey via Dhaka Tribune, 11 Feb 2026; IRI polls referenced in Al Jazeera)।
সাম্প্রতিক জরিপের ফলাফল মিশ্র কিন্তু ক্লোজ রেস নির্দেশ করে-
EASD জরিপ (৪১,৫০০+ রেসপন্ডেন্ট)
বিএনপি জোট ২০৮ আসন (৬৬.৩% ভোট), জামায়াত জোট ৪৬ আসন, জাতীয় পার্টি ৩, অন্যান্য ৪, স্বতন্ত্র ১৭। এটি BNP-ফেভারেবল। (সূত্র: Prothom Alo, Daily Star, 9-10 Feb 2026)।
IILD জরিপ (৬৩,০০০+ রেসপন্ডেন্ট)
ভোট শেয়ার বিএনপি ৪৪.১%, জামায়াত জোট ৪৩.৯%। নিশ্চিত জয়: জামায়াত জোট ~১০৫ আসন, বিএনপি ~১০১ আসন, ক্লোজ কনটেস্ট ~৭৫ আসন। (সূত্র: Dhaka Tribune, Prothom Alo, 9-11 Feb 2026)।
NRC জরিপ
বিএনপি ২২০ আসন (৭৭% ভোট), জামায়াত ৫৭। এটি অতিরঞ্জিত বলে মনে করা হয়। (সূত্র: Mint, The Week, 10-11 Feb 2026)।
আঞ্চলিক ট্রেন্ড
ঢাকা (শহুরে) বিএনপি এগিয়ে; চট্টগ্রাম মিশ্র (শহরে বিএনপি, গ্রামে জামায়াত)।
রাজশাহী-রংপুর বিএনপির স্ট্রংহোল্ড কিন্তু চ্যালেঞ্জ; খুলনা-ময়মনসিংহে জামায়াতের সার্জ। (সূত্র: Daily Star, Dhaka Tribune)।
বিশ্লেষণ ও সমীকরণ
বিএনপির শক্তি তারেক রহমানের নেতৃত্ব, পুরনো আওয়ামী লীগ ভোটারদের ৪৮-৬০% সমর্থন এবং শহুরে/তরুণ ভোট। কিন্তু বিদ্রোহী (৭৯-৯২ আসন) + চাঁদাবাজি অভিযোগ + অভিমান থেকে ভোট না দেওয়া দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১৫১+) ঝুঁকিতে ফেলেছে।
জামায়াতের লাভ মূলত বিএনপির দুর্বলতা + নিজস্ব গ্রাসরুট + অ্যান্টি-করাপশন ইমেজ + গ্রাম/যুব সার্জ থেকে। IILD-এর মতো জরিপ সত্যি হলে জামায়াত জোট ১০০+ আসন পেয়ে পাওয়ার ব্রোকার হতে পারে।
EASD-এর মতো হলে বিএনপি ক্লিয়ার জয়। বর্তমান ট্রেন্ডে জামায়াতের “সেরা পারফরম্যান্স” (best-ever) নিশ্চিত, এমনকি সরকার গঠন না করলেও। (সূত্র: Reuters, Al Jazeera, Crisis Group references; Daily Star, Prothom Alo)।
নির্বাচনের দিন ভোটার টার্নআউট, শেষ মুহূর্তের প্রচার, আইনশৃঙ্খলা ও রেফারেন্ডাম (জুলাই চার্টার) সবকিছু প্রভাব ফেলবে। ফলাফল ১২ ফেব্রুয়ারির পরই চূড়ান্ত। এটি নিরপেক্ষ সূত্রভিত্তিক; পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে পারে।
২০২৪ আন্দোলন বাংলাদেশকে একটি নতুন যুগে নিয়ে গেছে—স্বৈরশাসনের অবসান, যুবকদের ক্ষমতায়ন, কিন্তু মানবিক ক্ষয়ক্ষতি এবং অস্থিরতা। এটি স্বল্পমেয়াদী কষ্ট ঘটালেও দীর্ঘমেয়াদে সংস্কারের মাধ্যমে একটি আরও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়তে পারে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP)-এর মতে, তরুণ প্রজন্ম এমন একটি সমাজ চায় যা হবে আরও সহানুভূতিশীল ও ন্যায়নিষ্ঠ। ২০২৬ সালের নির্বাচনই নির্ধারণ করবে সেই আকাঙ্ক্ষার বাস্তব রূপ।







