গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে: বাংলাদেশের সংবিধান হবে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদসহ ৮৪টি বড় সংস্কার কার্যকর হবে- জুলাই সনদ
বিশেষ প্রতিবেদক: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে বাংলাদেশে কার্যকর হবে জুলাই সনদ, যা বিদ্যমান সংবিধানের ৮৪টি ধারায় সংস্কার আনার মাধ্যমে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে। এই সনদ বাস্তবায়নের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য ফিরে আসবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় সক্রিয় হবে এবং ন্যায়পাল, সরকারি নিয়োগ ও বিভিন্ন কমিশনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক হবে।
জুলাই সনদ কার্যকর হলে প্রধানমন্ত্রী একাধিক পদে থাকতে পারবেন না এবং এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ বা ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাও ভারসাম্যপূর্ণ হবে। জরুরি অবস্থার সময় মন্ত্রিসভার অনুমোদন বাধ্যতামূলক হবে এবং সভায় বিরোধী দলীয় নেতা বা উপনেতাকে উপস্থিত থাকতে হবে। মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন গোপন ব্যালটের মাধ্যমে, এবং রাষ্ট্রপতির নিয়োগ প্রক্রিয়ায়ও সংস্কার আসবে।
সংসদীয় কাঠামোতে সংস্কার
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয় পেলে বাংলাদেশে সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে। উচ্চকক্ষে সদস্য সংখ্যা থাকবে ১০০ জন। আসন বণ্টন হবে রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে। নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসন বর্তমান ৫০ থেকে ক্রমান্বয়ে ১০০-এ উন্নীত করা হবে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত হবেন যথাক্রমে সরকারি দল ও বিরোধী দল থেকে। সংসদ সদস্যরা বাজেট ও আস্থা ভোট ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন, এবং নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্ব কমিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির সঙ্গে ভাগ করা হবে।
আইন ও বিচারব্যবস্থায় সংস্কার
প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হবে আপিল বিভাগ থেকে, আর ন্যায়পাল নিয়োগে সাত সদস্যের সমন্বিত কমিটি গঠন করা হবে। সরকারি কর্ম কমিশন, মহা হিসাব নিরীক্ষক, দুদক চেয়ারম্যান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হবে। ৩৭টি ধারা আইন, অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা যাবে। এছাড়া জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন, শিক্ষা সংস্কার কমিশন, স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন ও সাধারণ সরকারি কর্ম কমিশন গঠন করা হবে।
প্রশাসনিক ও ভৌগোলিক পরিবর্তন
কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি নতুন প্রশাসনিক বিভাগ গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। ভাষা ও জাতীয় পরিচয়ের ক্ষেত্রে সংস্কার আনা হবে—বাংলা বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে থাকবে, তবে অন্যান্য মাতৃভাষাকেও স্বীকৃতি দেওয়া হবে। নাগরিকদের জাতীয় পরিচয় ‘বাঙালি’ থেকে পরিবর্তিত হয়ে ‘বাংলাদেশি’ হবে।
সংবিধানের মূলনীতি ও মৌলিক অধিকার
বর্তমান বাঙালি জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার পরিবর্তে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হলে নতুন মূলনীতি হবে—সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি। মৌলিক অধিকার ২২টি থেকে বৃদ্ধি পাবে; এতে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট অধিকার এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
৮৪টি সংস্কারের বাস্তবায়ন
মোট ৮৪টি সংস্কারের মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং বাকি ৩৭টি আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে আগামী সংসদ এই ৮৪টি ধারা কার্যকর করতে বাধ্য থাকবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ২৭০ দিনের (৯ মাস) মধ্যে জুলাই সনদ অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন করতে হবে। না করলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া সংবিধান সংশোধন বিল স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাস হিসেবে গণ্য হবে।
সার্বিক প্রভাব
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো, সংসদ, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও নাগরিক অধিকারগুলোর ওপর ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। দেশটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, শক্তিশালী তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাবে। এই সংস্কার গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং সব সম্প্রদায়ের যথাযথ মর্যাদা নিশ্চিত করবে।
এককথায় ‘হ্যাঁ’ ভোট দেশের সংসদীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করবে এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করবে।







