পার্বত্য বান্দরবানে ভোটের মাঠে মুখোমুখি বিএনপি ও এনসিপি

ছবি: নিজস্ব

বান্দরবান-৩০০ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উত্তাপ তুঙ্গে!

টুইট প্রতিবেদক: বাংলাদেশের পার্বত্য জেলা বান্দরবানের একমাত্র সংসদীয় আসন (৩০০ নং) এ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা এখন শেষ পর্যায়ে। ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এবং প্রচারণা শেষ হবে ১০ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে।

পাহাড়ি-বাঙালি মিশ্রিত এই দুর্গম এলাকায় ভোটাররা সক্রিয়, এবং প্রার্থীদের গণসংযোগ, পথসভা, মিছিল ও উঠান বৈঠক চলছে জোরেশোরে।

এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস/জেএসএস) এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী না থাকায় (জামায়াতের প্রার্থী প্রত্যাহার করেছেন) মাঠ অনেকটা ‘খালি’ হয়ে গেছে। এতে বিএনপি প্রার্থী সাচিং প্রু জেরী (ধানের শীষ) এর জন্য সুবিধাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় বিশ্লেষক ও ভোটারদের মত।

অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রার্থী আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দীন (শাপলা কলি) এর প্রচারণায় তরুণ ও নতুন ভোটারদের অংশগ্রহণ বেশি, কিন্তু তার কক্সবাজারের মহেশখালীতে বাড়ি হওয়ায় স্থানীয়ত্ব নিয়ে কিছু ক্ষোভ রয়েছে। তবে তার সর্বশেষ প্রার্থী তালিকা ও প্রতীক নির্বাচন কমিশন অনুমোদিত হয়।

মনোনয়ন বৈধ হওয়ার পর ৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। জামায়াতের প্রার্থী প্রত্যাহারের পর ৪ জন মাঠে আছেন।

সাচিং প্রু জেরী (ধানের শীষ) – বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বান্দরবান জেলা বিএনপির কনভেনর। স্থানীয়ভাবে ‘রাজপুত্র’ নামে পরিচিত।

আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দীন (শাপলা কলি) – জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ১১ দলীয় জোটের অংশ। ৩৩ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক, এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব।

মো. আবুল কালাম আজাদ (হাত পাখা) – ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

আবু জাফর মোহাম্মদ ওয়ালীউল্লাহ (লাঙ্গল) – জাতীয় পার্টি (জাপা)।

জামায়াতের আবুল কালাম সর্বশেষ তিনি প্রার্থীতা প্রত্যাহার করেছেন।

ভোটার ও কেন্দ্রের তথ্য

মোট ভোটার: ৩ লাখ ১৫ হাজার ৪২২ (পুরুষ: ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৫, নারী: ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪৭)।
নতুন ভোটার: প্রায় ৭ হাজার ৪৬৯।

ভোটকেন্দ্র: ১৮৬ টি (এর মধ্যে ৩৪-৩৮ টি ঝুঁকিপূর্ণ/অতি দুর্গম, যেখানে ভোটারদের ২০ কিমি পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়; মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই অনেক জায়গায়)।

উপজেলা: বান্দরবান সদর, রুমা, রোয়াংছড়ি, থানচি, লামা, আলীকদম (৬টি উপজেলা, ২ পৌরসভা, ৩৪ ইউনিয়ন)।

ছবি: নিজস্ব

প্রচারণার সর্বশেষ

সাচিং প্রু জেরী (বিএনপি): প্রতিদিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত গণসংযোগ, জনসভা, মিছিল ও উঠান বৈঠক। নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান সদর, রুমাসহ বিভিন্ন উপজেলায় জনতার ঢল নেমেছে। প্রতিশ্রুতি: পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি, ভোটাধিকার ফিরিয়ে আনা, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-যোগাযোগ-পর্যটন উন্নয়ন, ভূমি বিরোধ নিরসন, সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতকরণ। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীরা তাকে মন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান।

আবু সাঈদ সুজাউদ্দীন (এনসিপি): গ্রাম-শহরে সক্রিয়, লামা, আলীকদম, সদরে মিছিল ও গণসংযোগ। প্রতিশ্রুতি: সরকারি সেবা দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া, যুব কর্মসংস্থান, পরিবেশ রক্ষা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্প ও ঋণ সুবিধা। তরুণদের অংশগ্রহণ বেশি, কিন্তু ‘বহিরাগত’ হওয়ার অভিযোগে কিছু নেতাকর্মীর মধ্যে অসন্তোষ।

অন্য প্রার্থী: আবুল কালাম আজাদ (ইসলামী আন্দোলন) সদর, রুমা, রোয়াংছড়িতে মাইকিং ও বাজারকেন্দ্রিক প্রচার। আবু জাফর (জাপা) সদর, রোয়াংছড়িতে গান-ব্যানার নিয়ে প্রচার, পর্যটন ও অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি।

স্থানীয় ভোটারদের মতামত ও বিশ্লেষণ

ভোটাররা (পাহাড়ি-বাঙালি উভয়) সুষ্ঠু নির্বাচন, শান্তি-সম্প্রীতি, ভূমি বিরোধ নিরসন, যোগাযোগ-শিক্ষা-স্বাস্থ্য উন্নয়ন চান। অনেকে বলছেন, দীর্ঘদিন পর প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হচ্ছে, আশাবাদী। তবে প্রত্যাশা কম—যে জিতুক, বাস্তব সমস্যা সমাধান করুক। স্থানীয় শিক্ষার্থী ও চায়ের দোকানে আলোচনা: বিএনপির সুযোগ ভালো, এনসিপির পরিচিতি কম।

গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু

সীমান্ত নিরাপত্তা, পাহাড়ি শান্তি, ভূমি-বিরোধ, পর্যটন-পরিবেশ সংরক্ষণ, বৈষম্য দূরীকরণ। এ আসন জাতীয় রাজনীতিতে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ।

বান্দরবান-৩০০ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী (যেমন অ্যাডভোকেট আবুল কালাম বা অন্যান্য) মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছেন, যা জোটের অভ্যন্তরীণ সমঝোতা বা কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের ফল। এতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা বিএনপির সাচিং প্রু জেরী (ধানের শীষ) এবং এনসিপির আবু সাঈদ মো. সুজাউদ্দীন (শাপলা কলি)-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।

জামায়াতের অনুপস্থিতি বিএনপির জন্য ‘খালি মাঠ’ তৈরি করেছে, কারণ জামায়াতের ভোট ব্যাংক (বিশেষ করে মুসলিম অংশে) অনেক ক্ষেত্রে বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে। স্থানীয় রিপোর্টে জেরীর গণসংযোগ, জনসভা ও উঠান বৈঠক সবচেয়ে জোরালো, যা তার জয়ের সম্ভাবনাকে বাড়িয়েছে। অন্যদিকে সুজাউদ্দীনের প্রচারণা তরুণদের মধ্যে ভালো হলেও ‘বহিরাগত’ (কক্সবাজারের বাসিন্দা) অভিযোগে কিছু ক্ষোভ রয়েছে।

ভোটাররা শান্তি, উন্নয়ন ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান—যে প্রার্থী এগুলো কার্যকরভাবে প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে, তার জয়ের পথ প্রশস্ত।

এখন নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনে সুষ্ঠু ভোটের আশা জনগণের। ভোটাররা বলছেন: “প্রতিশ্রুতির ঝুলি নয়, কাজ চাই!”