নির্বাচনের বাইরে পাহাড়ের বড় রাজনৈতিক বার্তা

খাগড়াছড়িতে ত্রিমুখী লড়াই, রাঙামাটি–বান্দরবানে সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা।
অসীম রায় (অশ্বিনী), বান্দরবান: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সারাদেশে যখন রাজনৈতিক উত্তাপ, প্রচারণা ও মেরুকরণ তীব্র, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান—উপস্থাপন করছে ভিন্ন এক নির্বাচনী বাস্তবতা। কোথাও সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কোথাও নীরবতা, আবার কোথাও কৌশলগত সমঝোতার ইঙ্গিত—সব মিলিয়ে পাহাড়ের নির্বাচন এবার কেবল ভোটের হিসাব নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তার বাহক বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।
স্থানীয় বাসিন্দা, রাজনৈতিক কর্মী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই অঞ্চলের নির্বাচন প্রার্থী বা দলের প্রতিযোগিতার গণ্ডি ছাড়িয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য, জাতিগত সম্পর্ক, আঞ্চলিক প্রভাব এবং নিরাপত্তা বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কৌশলের আভাস
খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) প্রার্থী দিলেও বান্দরবানে সাংগঠনিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা প্রার্থী দেয়নি—এমন তথ্য মিলেছে স্থানীয় সূত্র থেকে। অপরদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) তিন জেলাতেই সরাসরি প্রার্থী না দেওয়ায় এটিকে অনেকেই কৌশলগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছেন।
রাঙামাটিতে জামায়াতে ইসলামী সরাসরি প্রার্থী না দিয়ে জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের প্রার্থীকে সমর্থন করছে। বান্দরবানেও জোটভিত্তিক সমর্থনের চিত্র দেখা যাচ্ছে। ফলে এই দুই জেলায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত—এমন ধারণা স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের।
রাঙামাটিতে ইউপিডিএফ-সমর্থিত প্রার্থী থাকলেও জেলার বড় অংশে জেএসএসের সাংগঠনিক প্রভাব বেশি—এমন দাবিও রয়েছে। এ ছাড়া ইউপিডিএফ প্রার্থীর পক্ষ থেকে নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়ে প্রশাসনের কাছে সাধারণ ডায়েরি ও লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
বান্দরবানে নির্বাচনী মাঠ তুলনামূলকভাবে একমুখী—এমন মতও শোনা যাচ্ছে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের কাছ থেকে।
খাগড়াছড়ি: ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উত্তাপ
তিন জেলার মধ্যে খাগড়াছড়িকেই সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখানে মোট ১১ জন প্রার্থী থাকলেও মূল লড়াই সীমিত হয়ে এসেছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও ইউপিডিএফ-সমর্থিত প্রার্থীর মধ্যে।
বিএনপির প্রার্থী আবদুল ওয়াদুদ ভুঁইয়া এর আগে এই আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। স্থানীয়ভাবে তাকে একজন প্রভাবশালী বাঙালি নেতা হিসেবে দেখা হয়। ইউপিডিএফ তাদের প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছে এবং জেএসএস বিএনপির এক বিদ্রোহী প্রার্থীকে সমর্থন করছে—এমন দাবি স্থানীয় সূত্রে থাকলেও দলগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।
জামায়াতে ইসলামী প্রার্থীও প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন এবং বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভোটের একটি অংশ তার দিকে ঝুঁকছে—এমন পর্যবেক্ষণও পাওয়া যাচ্ছে।
নিরাপত্তা ও ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খাগড়াছড়িতে মোট ২০৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে ভোটের পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। বিভিন্ন প্রতীকে ভোট দিলে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠলেও এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
বাঙালি ভোট, আঞ্চলিক সমীকরণ ও বিতর্ক
পার্বত্য অঞ্চলের কয়েকটি বাঙালি সংগঠনের দাবি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে শক্তিশালী বাঙালি প্রার্থী না থাকায় আঞ্চলিক দলগুলো সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যায়নি। তবে খাগড়াছড়িতে শক্ত প্রার্থী থাকায় আঞ্চলিক শক্তিগুলো বেশি সক্রিয়—এমন বিশ্লেষণ তাদের।
তাদের মতে, আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যে কৌশলগত সমন্বয় থাকলেও মূলধারার বাঙালি ভোট বিভক্ত হওয়ায় ফলাফলে তার প্রভাব পড়তে পারে। যদিও অন্য পর্যবেক্ষকদের মতে, পাহাড়ের ভোট আচরণ মূলত স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থী-ব্যক্তিত্ব, নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রশাসনিক বাস্তবতার ওপর নির্ভরশীল।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপট
ভূমি সমস্যা, আঞ্চলিক পরিষদ, প্রশাসনিক ক্ষমতা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন—এসব ইস্যু আবারও নির্বাচনী আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর স্পষ্ট ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এখনও প্রকাশ্য নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের নির্বাচনকে কেবল আসন বা ভোটের অঙ্কে দেখলে বাস্তবতা পুরোপুরি ধরা পড়ে না। এটি আঞ্চলিক রাজনীতি, জাতিগত সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রীয় নীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সে কারণে জাতীয় দলগুলোর জন্য পাহাড়ে প্রতিনিধিত্ব, জোট কৌশল ও রাজনৈতিক ভারসাম্য নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।






