পাহাড়ি ঝুপড়িতে পড়ছে ৬৪ শিশু: সরকারি অর্থ বেমালুম ঝুঁকিতে

ছবি: অসীম রায় (অশ্বিনী)

জরাজীর্ণ ঘরে স্বপ্নের পাঠশালা: টুকটংপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কান্না!

অসীম রায় (অশ্বিনী): বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি গ্রাম টুকটংপাড়ায় অবস্থিত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি আজও এক ঝুপড়ি টিনশেড ঘরে শ্বাস নিচ্ছে।

২০০৮ সালে গ্রামবাসীর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় ২০১৭ সালে জাতীয়করণ হয়। কিন্তু জাতীয়করণের পরও কোনো বড় সংস্কার বা নতুন ভবনের স্বপ্ন পূরণ হয়নি।

টানা নয় বছর ধরে ধুলাবালু, বৃষ্টি আর গাদাগাদি পরিবেশে চলছে পাঠদান।

বিদ্যালয়ে মাত্র ৬৪ জন শিক্ষার্থী ও পাঁচজন শিক্ষক (তিনজন নারী)। একটি মাত্র জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে পাঁচটি শ্রেণি একসঙ্গে পড়ে।

সামান্য বৃষ্টিতে কাদা-পানিতে ভরে যায় শ্রেণিকক্ষ। ধুলাবালুর কারণে শিক্ষার্থীদের বই-খাতা নষ্ট হয়ে যায়, শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রও রক্ষা করা যায় না।

স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার নেই—একটি মৌলিক চাহিদাও পূরণ হয় না এখানে।

২০২২ সালে আশার আলো জ্বলে উঠেছিল। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ে তিনতলা বিশিষ্ট নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মিল্টন ট্রেডার্স কাজ পায়। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও ভবনের কাজ শেষ হয়নি।

নির্মাণস্থলে গিয়ে দেখা যায়—মাত্র চারজন শ্রমিক কাজ করছেন। দরজা-জানালা, সিঁড়ির রেলিং, আসবাবপত্রসহ অনেক কাজ বাকি।

এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবদুর হানিফ জানান, নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ শেষ না হওয়ায় ঠিকাদারকে নিয়মিত তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

ঠিকাদারের ম্যানেজার মো. খোকন আহম্মেদের দাবি—নির্মাণসামগ্রী ও শ্রমিক মজুরির দাম বৃদ্ধির কারণে বিলম্ব। তবে আগামী জুন ২০২৬-এর মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে।

স্থানীয় প্রধান মাংসান ম্রো বলেন, চার বছরেও ভবন শেষ না হওয়ায় ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্টরা দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন।

অভিভাবক টিমপাও ম্রো ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও আমাদের সন্তানরা আজও ঝুপড়ি ঘরে পড়ছে।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা গুংগাবি ত্রিপুরা বলেন, প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে পড়াতে হয়। শিক্ষার্থীরা ভয়ে থাকে।

থানচি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সোনা মৈত্র চাকমা জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে। দ্রুত কাজ শেষের জন্য তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

এই ছোট্ট পাহাড়ি বিদ্যালয়ের শিশুরা স্বপ্ন দেখে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের। কিন্তু জরাজীর্ণ ঘরে সেই স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যাচ্ছে।

সরকারি প্রতিশ্রুতি ও অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘসূত্রতা ও অবহেলা কেন? এ প্রশ্ন আজ টুকটংপাড়ার ৬৪ শিশু ও তাদের অভিভাবকদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।

দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ ও নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।