বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিডিআর নাম পুনর্বহাল করা হবে: তারেক রহমান

মতবিনিময় সভায় তারেক রহমান:
রাজনৈতিক স্বার্থে সেনাবাহিনী ব্যবহারের বিরোধিতা করে সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ঘোষণা।

স্টাফ রিপোর্টার: বিএনপি ক্ষমতায় এলে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) নাম পুনর্বহাল করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, রাজনৈতিক স্বার্থে কোনোভাবেই সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

সেনাবাহিনীর গৌরব ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো কাজ বিএনপি অতীতেও করেনি, বর্তমানেও করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না বলে আশ্বাস দেন তিনি।

শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেল রেডিসন ব্লুতে অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সামরিক বাহিনীর সদস্য ও পিলখানায় শহীদ সেনা পরিবারের সদস্যদের সম্মানে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তারেক রহমান।

অনুষ্ঠানে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জোবাইদা রহমান। শুরুতেই উপস্থিত সাবেক সেনা কর্মকর্তা, শহীদ পরিবারের সদস্য ও সাংবাদিকদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি এই আয়োজনের জন্য আয়োজকদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

মতবিনিময় সভায় নিজের অনুভূতির কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, তিনি ও তার স্ত্রী এদিন কিছুটা স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন। তিনি জানান, বরাবরই তিনি সেনাবাহিনী ও সশস্ত্র বাহিনীকে তার বৃহত্তর পরিবার হিসেবেই বিবেচনা করেন। শৈশবে পিতাকে হারালেও বড় হয়ে দেখেছেন সেনাবাহিনীর প্রতি তার মা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গভীর আস্থা, নির্ভরতা ও সম্মান ছিল। তার বিশ্বাস ছিল, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি শক্তিশালী ও মর্যাদাশীল সেনাবাহিনী অপরিহার্য।

তারেক রহমান আরও বলেন, সন্তান হিসেবে যেমন তিনি তার পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে গর্ব করেন, তেমনি একজন সেনা কর্মকর্তা হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে শহীদ জিয়া পুরো সেনাবাহিনীকেও গর্বিত করেছিলেন। স্বাধীনতাপ্রিয় গণতান্ত্রিক জনগণ যেমন শহীদ জিয়াকে নিয়ে গর্ব করে, তেমনি বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীও তাকে নিয়ে গর্বিত—এ বিশ্বাস তার দৃঢ় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বক্তব্যে তিনি বলেন, জনগণ সেনাবাহিনীকে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের নির্ভরযোগ্য প্রহরী হিসেবে দেখে।

সেনাবাহিনীকে ভিন্ন কাজে যুক্ত করা হলে তাদের মূল দায়িত্ব ও উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। বিগত দেড় দশকে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ও গৌরব নিয়ে যদি সেনা কর্মকর্তা ও সদস্যরা নিজেদের বিবেককে প্রশ্ন করেন, তাহলে অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যাবে বলেও মন্তব্য করেন বিএনপির এই শীর্ষ নেতা।

দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে তারেক রহমান বলেন, যখন দেশ ফ্যাসিবাদ ও তাঁবেদার অপশক্তির কবলে পড়ে, তখন শুধু গণতন্ত্র ও মানুষের স্বাধীনতাই নয়, একই সঙ্গে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বও হুমকির মুখে পড়ে। এ সময় তিনি সেনাবাহিনীর গৌরব ও পেশাদারিত্ব রক্ষায় সবাইকে সচেতন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে সংঘটিত পিলখানা হত্যাযজ্ঞের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ওই নির্মম ঘটনার পরও দিনটিকে সেনাবাহিনী যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে পালন করতে পারেনি বা পালন করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, “আমি সেনাবাহিনীর হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলতে চাই না; বরং গৌরব অর্জন করা এবং তা ধারণ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেনাবাহিনীর গৌরব সেনাবাহিনীকেই রক্ষা করতে হবে।”

তিনি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের নিজেদের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে সতর্ক ও সচেতন থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বলেন, সেনাবাহিনী অবশ্যই রাজনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকবে, তবে রাজনীতিতে বিলীন হয়ে যাওয়া কখনোই উচিত নয়।

তারেক রহমান বলেন, ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাযজ্ঞের পর পতিত ও পলাতক ফ্যাসিবাদী অপশক্তি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে দেয় এবং এমনকি তাদের ইউনিফর্মও বদলে ফেলা হয়। ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, “জনগণের রায়ে বিএনপি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তাহলে আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বিডিআর নাম পুনর্বহাল করতে চাই।”

তিনি আরও জানান, ভবিষ্যতে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সেনাবাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করে পিলখানা সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবসকে ‘শহীদ সেনা দিবস’, ‘সেনা হত্যাযজ্ঞ দিবস’ অথবা জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি দিবস হিসেবে ঘোষণার পরিকল্পনাও রয়েছে।

অনুষ্ঠানে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে উপস্থাপিত বিভিন্ন সুপারিশের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন, সেনা আইনের কিছু বিধিমালা সংস্কারসহ প্রস্তাবগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে জনগণের রায়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করে এসব সুপারিশ পর্যালোচনা ও পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ও সদস্যদের দীর্ঘদিনের দাবি ‘ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পে’ নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, বিএনপি ইতোমধ্যে তাদের দলীয় ইশতেহারে এই নীতি অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং জাতির সামনে তা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছে। বিএনপি সরকার গঠন করলে যত দ্রুত সম্ভব ওয়ান র‍্যাঙ্ক ওয়ান পে বাস্তবায়ন করা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

পরিশেষে তারেক রহমান বলেন, তাকে ও তার স্ত্রীকে এই মতবিনিময় সভায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য তিনি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তিনি সবার সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করে বলেন, “আসুন, আমরা সবাই মিলে একটি সুন্দর, নিরাপদ ও প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলার চেষ্টা করি—ইনশাল্লাহ।”