গাড়ি রিকুইজিশনে দেশজুড়ে আতঙ্ক

ত্রয়োদশ নির্বাচন ঘিরে যানবাহন অধিগ্রহণে পরিবহন খাত চরম চাপে
টুইট প্রতিবেদক: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে গাড়ি রিকুইজিশন (যানবাহন অধিগ্রহণ) ইস্যু নতুন করে তীব্র আলোচনার জন্ম দিয়েছে। নির্বাচন নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের জন্য বিপুল সংখ্যক যানবাহন অধিগ্রহণ শুরু হওয়ায় পরিবহন মালিকদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ, আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বাস, মাইক্রোবাস ও লেগুনা রিকুইজিশনের চাপ বাড়ায় পরিবহন খাত কার্যত অচল হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) প্রায় ৫ হাজার যানবাহন রিকুইজিশনের পরিকল্পনা করেছে। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৪০০টি বাস, ১ হাজার ১০০টি লেগুনা, এক হাজারের বেশি মাইক্রোবাস এবং অন্তত ৩০টি ট্রাক রয়েছে। একই সঙ্গে সারাদেশে দূরপাল্লার বাসসহ বিভিন্ন ধরনের যানবাহন মিলিয়ে প্রায় ২০ হাজারের কাছাকাছি গাড়ি রিকুইজিশন করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।
এসব যানবাহন পুলিশ, সেনাবাহিনী, আনসার, বিজিবি, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট টিম ও টেলিকম সেবাসহ মোট ৯টি সংস্থার বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হবে।
রিকুইজিশন করা যানবাহনগুলো মূলত মোবাইল ডিউটি, ফোর্স মুভমেন্ট, টহল, মালামাল ও সরঞ্জাম পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। সাধারণত এসব গাড়ি ৩ থেকে ৫ দিনের জন্য নেওয়া হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ৭ দিন পর্যন্ত হতে পারে। জানা গেছে, ৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই বিভিন্ন এলাকায় মালিকদের কাছে নোটিশ দিয়ে গাড়ি বুঝে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এই রিকুইজিশনকে ঘিরে যানবাহন মালিকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো ক্ষতিপূরণের অনিশ্চয়তা। আইন অনুযায়ী গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ এবং ডিএমপি অধ্যাদেশ ১৯৭৬ অনুসারে, অধিগৃহীত গাড়ির জন্য স্থানীয় বাজারদর অনুযায়ী ভাড়া বা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক সময় পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করছেন মালিকরা।
অতীতে নির্বাচনের সময় গাড়ি রিকুইজিশনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তারা বলছেন, জ্বালানি খরচ, চালক ও হেলপারের বেতন এবং খোরাকি কে বহন করবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা বাস্তবে মানা হয় না।
অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিও মালিকদের বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবহন মালিকদের হিসাব অনুযায়ী, একটি শহরতলির বাস যদি টানা ৭ দিন রিকুইজিশনে থাকে, তাহলে গড়ে ৩৫ হাজার টাকা বা তারও বেশি আয় থেকে বঞ্চিত হতে হয়। অনেক মালিক ব্যাংক ও লিজিং প্রতিষ্ঠানের ঋণে গাড়ি কিনেছেন। গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকলে সেই সময়ের কিস্তি, স্টাফদের বেতন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বহন করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশনের সম্ভাবনা নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ গাড়ি মালিকদের মধ্যে। যদিও হাইকোর্টের পূর্ববর্তী একাধিক রায়ে ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশনের ওপর নিষেধাজ্ঞার কথা বলা হয়েছে, তবুও ডিএমপি জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে ব্যক্তিগত গাড়িও নেওয়া হতে পারে। এতে করে চাকরিজীবী ও ছোট ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ভোট উপলক্ষে ঘোষিত চার দিনের সরকারি ছুটিকে কেন্দ্র করে দূরপাল্লার যাত্রী পরিবহনেও বড় সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতি নির্বাচনে এ সময় বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রামের বাড়িতে যান। দূরপাল্লার বাস রিকুইজিশন হলে টিকিট সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং চরম যাত্রী ভোগান্তি তৈরি হতে পারে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করেছেন।
নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে ডিএমপিকে দেওয়া এক চিঠিতে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, রিকুইজিশনের ক্ষেত্রে অবশ্যই আইন মেনে স্থানীয় হারে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও তা মালিকদের পরিশোধ করতে হবে। একই সঙ্গে কোনো মালিক ক্ষতিপূরণে অসন্তুষ্ট হলে ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আবেদন করে সালিশের মাধ্যমে পুনর্নির্ধারণের সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় এসব সুযোগ কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে বলে মালিকদের অভিযোগ।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি এক সংবাদ সম্মেলনে এই পরিস্থিতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। সংগঠনের নেতারা বলেন, এত বড় পরিসরে বিশেষ করে দূরপাল্লার বাস রিকুইজিশনের নজির অতীতে খুব কমই দেখা গেছে। সরকারি গাড়ি থাকা সত্ত্বেও ব্যক্তিগত ও বাণিজ্যিক যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া অযৌক্তিক বলে তারা মনে করেন।
তাদের দাবি, নির্বাচন পরিচালনায় স্থানীয় পর্যায়ের বাস, মাইক্রোবাস এবং সরকারি যানবাহন ব্যবহার করলেই যথেষ্ট।
সব মিলিয়ে নির্বাচনের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে গাড়ি রিকুইজিশন ইস্যুতে মালিক, চালক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে টানাপোড়েন ও অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে।
আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দিতেই হবে, স্থানীয় রেটে, এবং অসন্তুষ্ট হলে আরবিট্রেশনের সুযোগ আছে। কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগে ঘাটতি থাকে। যদি আপনার গাড়ি রিকুইজিশন হয়, তাহলে লিখিত রসিদ/নোটিশ নিন, রেট জেনে নিন এবং প্রয়োজনে ৩০ দিনের মধ্যে আবেদন করুন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক মালিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, “আইন আছে, নিয়ম আছে—কিন্তু বাস্তবে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায় না।”
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই ইস্যু আরও বড় আকার নিতে পারে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।






