নির্বাচনের প্রচারণায় সহিংসতা বাড়ছে: কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছে!

নির্বাচনের প্রচারণা শেষ পর্যায়ে: সহিংসতা বাড়ছে, কাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখা হচ্ছে?

টুইট প্রতি‌বেদক: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সাংবিধানিক গণভোটের প্রচারণা এখন শেষ ধাপে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এটিই প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যেখানে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় মূল লড়াই হচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামীসহ ১১-দলীয় জোটের মধ্যে।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৩০০ আসনে প্রায় ২ হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, যার মধ্যে অনেকেই কোটিপতি। টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ৮৯১ জন কোটিপতি প্রার্থী।

বিভিন্ন জরিপে বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সবচেয়ে এগিয়ে দেখা হচ্ছে—একটি জরিপে ৭০% ভোটার বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে। জামায়াতের সমর্থন ১৯% এর কাছাকাছি। তারেক রহমান নিজে বলেছেন, “জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করব—এটাই আমার প্রতিশ্রুতি।”

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ক্রাইসিস গ্রুপসহ আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকারের সামনে অর্থনৈতিক সংকট, সাংবিধানিক সংস্কার, আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধার ও জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার মতো বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গণভোটে জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন নিয়ে ভোটাররা সিদ্ধান্ত নেবেন।

সহিংসতার উদ্বেগ বাড়ছে

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, রাজনৈতিক সহিংসতা তত বাড়ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, ডিসেম্বরে ১৮টি ঘটনায় ৪ জন নিহত ও ২৬৮ জন আহত হয়েছে; জানুয়ারিতে ৭৫টি ঘটনায় ১১ জন নিহত ও ৬১৬ জন আহত।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে কমপক্ষে ১৬ জন রাজনৈতিক কর্মী নিহত হয়েছেন। প্রচারণা কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ, হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘন ঘন ঘটছে। নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থার কথা বললেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। অপর‌দি‌কে কলকাতায় নির্বাসিত আওয়ামী লীগের নেতারা সমর্থকদের উসকানি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ সরকা‌রের।

আওয়ামী লীগের অবস্থান

নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেত্রী শেখ হাসিনা (বর্তমানে ভারতে নির্বাসিত) এ নির্বাচনকে “প্রহসন” বলে বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন। দলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বর্জনের মাধ্যমে “জনগণের ভোটের অধিকার” রক্ষা করা হবে। ত‌বে তা‌দের সাধারণ সমর্থক‌দের বিএন‌পির লে-জুড় ধর‌তে বেশী দেখা গে‌ছে। মাঠ পর্যয়ের নেতার‌া ‌বিএন‌পি‌কে নিরাপদ ম‌নে কর‌ছেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের একটি। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ায় দলটি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং ১১-দলীয় জোট (NCP-সহ) নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপির সঙ্গে দ্বিমুখী লড়াইয়ে রয়েছে।

সাম্প্রতিক জরিপে (IRI, অন্যান্য) বিএনপির ৩৩-৩৫% সমর্থনের কাছাকাছি জামায়াত ২৯-৩৩.৬% পেয়েছে—কোনো কোনোতে দ্বিতীয় বা খুব কাছে। আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে সারাদেশে (চট্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নওগাঁ প্রভৃতি) জনসভা-র‍্যালি চলছে; প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে প্রচার তুঙ্গে।

দলটি দুর্নীতিমুক্তি, সুদবিহীন অর্থনীতি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ, যুব উন্নয়ন ও জুলাই সনদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচার চালাচ্ছে। জোটে NCP-এর সঙ্গে আসন-বণ্টন নিয়ে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা থাকলেও সোশ্যাল মিডিয়া ও যুব-ছাত্র (শিবির) সমর্থন শক্তিশালী।

অপর‌দি‌কে আমিরের এক্স অ্যাকাউন্ট হ্যাকিং, নারী নেতৃত্ব নিয়ে মন্তব্যের সমালোচনা, বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষ-অভিযোগ (নারী কর্মী হয়রানি, নওগাঁয় আহত ১৩), কিছু প্রার্থীর অসৌজন্যমূলক আচরণ ও AI-সম্পাদিত ছবির অভিযোগ উঠে‌ছে। তা‌দের বিষ‌য়ে সংখ্যালঘু-মধ্যপন্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। তবে জামায়াত এবার ঐতিহাসিক সাফল্যের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচিত হ‌চ্ছে।

আন্তর্জাতিক প্রভাব

ভারত, চীন ও পাকিস্তান নির্বাচনের ফলাফল ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারত সম্পর্ক রিসেট করতে চায়, চীন অবকাঠামো বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রভাব বাড়াতে চাইছে।
ভোটারদের মধ্যে (বিশেষ করে জেন-জি) উৎসাহ থাকলেও সুষ্ঠু নির্বাচন, ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা ও পরবর্তী স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত। এ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও নতুন যুগের শুরু হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নিরাপত্তা ও প্রস্তুতি

নির্বাচন কমিশন বিএনসিসি ক্যাডেট মোতায়েনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করেছে। আনসার-গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীসহ সব বাহিনী সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করবে। কোস্ট গার্ড অবৈধ কার্যক্রম রোধে হটলাইন ‘১৬১১১’ চালু রেখেছে।

ভোটারদের মধ্যে উৎসাহ থাকলেও সহিংসতা, নিরপেক্ষতা ও ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ নির্বাচন বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

(প্রতিবেদনটি প্রথম আলো, বিবিসি বাংলা, আল জাজিরা, ক্রাইসিস গ্রুপ, দ্য ডিপ্লোম্যাট ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রের সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি।)