আজ পবিত্র শবে বরাত: মাগফিরাত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির রাত

ছবি: এআই

দুর্বল হাদিস ও সহিহ সুন্নাহ নিয়ে আলেমদের মতভেদ! উপমহাদেশে ব্যাপক পালন, আরব বিশ্বে নেই বিশেষ আয়োজন।

টুইট প্রতিবেদক: আজ মঙ্গলবার দিবাগত রাত থেকে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের মুসলিম সম্প্রদায় পবিত্র শবে বরাত (শব-ই-বরাত বা লাইলাতুল বরাআত) পালন করছে। হিজরি শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত থেকে ১৫ তারিখের রাতকে শবে বরাত হিসেবে গণ্য করা হয়।

গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা থেকে ৪ ফেব্রুয়ারি ভোর পর্যন্ত বিস্তৃত। এ উপলক্ষে সরকার ৪ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) সারাদেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছে।

সূর্যাস্তের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে মুসলমানরা নফল নামাজ, কুরআন তিলাওয়াত, ইস্তেগফার, জিকির-আজকার ও দোয়ার মাধ্যমে রাতটি পালন করছেন। দৈনিক ইত্তেফাকের আজকের (৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন মসজিদে ওয়াজ মাহফিল, জিকির ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি রেডিও-টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে শবে বরাতের তাৎপর্য নিয়ে বিশেষ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে।

পবিত্র শবে বরাত উপলক্ষে প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস এক বাণীতে এ রাতকে রহমত, মাগফিরাত ও আত্মিক পরিশুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি দেশ ও জাতির শান্তি, সমৃদ্ধি এবং কল্যাণ কামনা করে সকলকে আল্লাহর দরবারে তওবা ও দোয়ার আহ্বান জানান।

শবে বরাতের তাৎপর্য ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট

শবে বরাতকে আরবি পরিভাষায় বলা হয় “লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান”, যার অর্থ শাবান মাসের মধ্যরাত। ‘বরাআত’ শব্দের অর্থ মুক্তি বা ক্ষমা—এ কারণে এ রাতকে অনেকেই গুনাহ থেকে মুক্তি ও ক্ষমা প্রার্থনার রাত হিসেবে বিবেচনা করেন। উপমহাদেশে-বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে-শবে বরাত ব্যাপকভাবে পালিত হয়ে আসছে। এ রাতে বিশেষ ইবাদতের পাশাপাশি হালুয়া-রুটি বিতরণ, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে খাবার পাঠানো এবং কবর জিয়ারতের প্রচলন রয়েছে।

তবে বিশ্ব মুসলিম সমাজে এর পালন একরকম নয়। ইরান ও তুরস্কসহ কিছু অঞ্চলে শবে বরাত ভিন্ন নামে পরিচিত হলেও সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং ইউরোপ-আমেরিকার অধিকাংশ দেশে এ রাতকে কেন্দ্র করে কোনো বিশেষ আনুষ্ঠানিক পালন দেখা যায় না।

হাদিসের অবস্থা ও আলেমদের মতভেদ

শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণিত কিছু হাদিস ইবনে মাজাহ ও বাইহাকী শরিফে পাওয়া যায়। এসব হাদিসে মধ্য শাবানের রাতে ইবাদত করা এবং পরদিন রোজা রাখার কথা উল্লেখ আছে। তবে মুহাদ্দিসদের মতে, এসব হাদিসের সনদ দুর্বল (ضعيف)। অন্যদিকে সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি সহিহ হাদিসে আল্লাহ তাআলার প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটবর্তী হওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা কোনো নির্দিষ্ট রাতের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়।

এ বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতভেদ বিদ্যমান। উপমহাদেশের অনেক আলেম ও সুফি-প্রভাবিত ধারার অনুসারীরা এ রাতকে ক্ষমা প্রার্থনার বিশেষ সুযোগ হিসেবে দেখেন এবং ব্যক্তিগত নফল ইবাদতকে উৎসাহিত করেন। অপরদিকে ইবনে তাইমিয়্যাহ, ইবনে রজবসহ বহু বিজ্ঞ আলেমের মতে, শবে বরাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ইবাদত বা আনুষ্ঠানিক পালন সম্পর্কে সহিহ হাদিস নেই। তাঁদের মতে, এ উপলক্ষে নির্দিষ্ট নামাজ, উৎসব বা বিশেষ রীতি পালন করা বিদআত (ধর্মে নতুন সংযোজন), কারণ রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না।

ঐতিহাসিক গ্রন্থগুলোতে উল্লেখ রয়েছে, শবে বরাতকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক পালন চতুর্থ-পঞ্চম শতাব্দী হিজরির দিকে (প্রায় ৪৪৮ হিজরি) ফিলিস্তিন অঞ্চলে প্রথম প্রচলিত হয়, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত হয়।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বাংলাদেশে ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে শবে বরাত পালিত হচ্ছে এবং ৪ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি। হাদিসের দুর্বলতা ও সহিহ হাদিসের সাধারণ প্রেক্ষাপট সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আলেমদের মধ্যে মতভেদ এবং আরব বিশ্বে এ রাতের বিশেষ পালন না থাকার বিষয়টিও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

সার্বিকভাবে শবে বরাত পালন নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও, ব্যক্তিগতভাবে নফল ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত ও ক্ষমা প্রার্থনা করা যেকোনো রাতেই গ্রহণযোগ্য আমল। বিতর্কিত বা উদ্ভাবিত রীতি পরিহার করে সহিহ সুন্নাহ অনুসরণ করাই অধিকাংশ আলেমের মতে উত্তম পথ।

আল্লাহ তাআলা যেন এ রাতে সকল মুসলমানের তওবা কবুল করেন এবং আমাদের সবাইকে হেদায়েত দান করেন—এই কামনাই সকলের।