আপনি কি জানেন? পুলিশ গাড়ি রিকুইজিশনের সর্বোচ্চ মেয়াদ!

পুলিশের গাড়ি রিকুইজিশনে লাগাম দিন: হাইকোর্টের ১১ বাধ্যতামূলক নির্দেশনা বাস্তবায়নে ভাটা!

টুইট প্রতিবেদক: ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা ও ট্যাক্সি জোরপূর্বক রিকুইজিশন করে পুলিশের অপব্যবহার বন্ধে যুগান্তকারী রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। এক জনস্বার্থ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত পুলিশের যানবাহন রিকুইজিশন ক্ষমতার ওপর ১১টি বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারি করেন এবং এসব নির্দেশনা সারাদেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্ষেত্রে বাস্তবায়নের সুস্পষ্ট আদেশ দেন।

Human Rights and Peace for Bangladesh (HRPB)-এর দায়ের করা Writ Petition No. 4304 of 2010 মামলায় বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২২ সালের ৮ জুন এই পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা করেন। আদালত বলেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ধারা ১০৩(ক) বহাল থাকলেও, এই ধারার অপব্যবহার কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং তা অবশ্যই সংবিধানসম্মত সীমার মধ্যে থাকতে হবে।

রায়ে কী স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে

হাইকোর্ট রায়ে স্পষ্ট করে বলেন, ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার, সিএনজি অটোরিকশা, ট্যাক্সি, রোগীবাহী যান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির গাড়ি এবং বিদেশগামী (এয়ারপোর্টগামী) যাত্রীর গাড়ি রিকুইজিশন করা আইনত অবৈধ। আদালতের মতে, এসব যানবাহন জোরপূর্বক ব্যবহার করা নাগরিকের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

রায়ে আরও উল্লেখ করা হয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে অতীতে বহু ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিককে হয়রানি করা হয়েছে, যা সংবিধানের চেতনা ও আইনের শাসনের পরিপন্থী। এ কারণে পুলিশের রিকুইজিশন ক্ষমতাকে কঠোর নিয়ম ও নজরদারির আওতায় আনা জরুরি বলে মত দেন আদালত।

হাইকোর্টের ১১টি বাধ্যতামূলক নির্দেশনা

রিকুইজিশন কেবলমাত্র জনস্বার্থে করা যাবে; ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কাজে নয়।

রিকুইজিশনের আদেশ দিতে পারবেন শুধু ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার।

রিকুইজিশনের আগে গাড়ির মালিককে কারণ উল্লেখ করে পূর্ব লিখিত নোটিশ দিতে হবে।

রিকুইজিশনের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ৭ দিন, এবং আদেশে সুনির্দিষ্ট দিন উল্লেখ করতে হবে।

রিকুইজিশনকৃত গাড়ি শুধু নির্ধারিত উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যাবে; অন্যথায় তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে।

নিষিদ্ধ যানবাহন: ব্যক্তিগত প্রাইভেট কার/মাইক্রোবাস, সিএনজি অটোরিকশা, ট্যাক্সি, রোগীবাহী গাড়ি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তির গাড়ি এবং এয়ারপোর্টগামী যাত্রীর যান।

প্রতিটি থানায় রিকুইজিশনকৃত গাড়ির তালিকা বা রেজিস্টার সংরক্ষণ করতে হবে।

জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য খরচ পুলিশ কর্তৃপক্ষ বহন করবে।

ক্ষতিপূরণ ও দৈনিক ভাতার হার নির্ধারণ করে ১৫ দিনের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে।

রিকুইজিশন সংক্রান্ত অভিযোগ এলে তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

ডিএমপি কমিশনারকে ৯০ দিনের মধ্যে সার্কুলার জারি করে সারাদেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশের ক্ষেত্রে নির্দেশনা কার্যকর করতে হবে।

সারাদেশে বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা

হাইকোর্ট রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এই নির্দেশনা শুধু ঢাকার জন্য নয়। ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, সিলেটসহ দেশের সব মেট্রোপলিটন পুলিশকে বাধ্যতামূলকভাবে কার্যকর করতে হবে। বাস্তবায়নে গাফিলতি হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

বাস্তব প্রেক্ষাপট ও জনস্বার্থ

২০২৬ সালের শুরুতে নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে ঘিরে পুলিশের গাড়ি রিকুইজিশন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ায় হাইকোর্টের এই রায় আবারও গুরুত্ব পাচ্ছে। আইনজ্ঞদের মতে, নির্বাচন, দুর্যোগ বা বিশেষ পরিস্থিতির অজুহাতেও ব্যক্তিগত গাড়ি রিকুইজিশনের কোনো বৈধতা নেই।

ইতিমধ্যে একটি বেসরকারি ব্যাংকের মালিকানাধীন পিকআপ ভ্যান (পল কার) ১৪ দিনের জন্য পুলিশ কর্তৃক রিকুইজিশন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

হাইকোর্টের ২০২২ সালের পূর্ণাঙ্গ রায় (Writ Petition No. 4304 of 2010) অনুযায়ী, রিকুইজিশনের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৭ দিন এবং তা শুধুমাত্র জনস্বার্থে করা যায়। কোনো যানবাহন ৭ দিনের বেশি রিকুইজিশন রাখা আইনত অবৈধ।

নাগরিকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা

এই রায় অনুযায়ী, যদি কোনো নাগরিকের ব্যক্তিগত গাড়ি অবৈধভাবে রিকুইজিশনের চেষ্টা করা হয়, তিনি হাইকোর্টের রায় দেখিয়ে আইনগতভাবে আপত্তি জানাতে পারেন। প্রয়োজনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি রিট আবেদন দায়েরের অধিকার রাখেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় ছিল নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় একটি মাইলফলক, যা পুলিশের ক্ষমতা ও দায়িত্বের মধ্যে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য নিশ্চিত করে এবং আইনের শাসনকে শক্তিশালী করে।