দক্ষিণ-পশ্চিম পাকিস্তানে ভয়ঙ্কর হামলা: একদিনে ১২৫ নিহত, রক্তক্ষয়ী সহিংসতা

ছবি: Al Jazeera

জনগণের প্রশ্ন: এটা কি বিদেশি ষড়যন্ত্র? নাকি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও অধিকারের দাবিতে স্থানীয় বিদ্রোহ? শান্তি ফিরিয়ে আনতে সংলাপ ও উন্নয়ন ছাড়া বিকল্প নেই। উভয় পক্ষের উসকানি কমিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

টুইট প্রতিবেদক: পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ বেলুচিস্তান গত ৩১ জানুয়ারি (শনিবার) ভয়াবহ সহিংসতার শিকার হয়েছে। সমন্বিত হামলা, আত্মঘাতী বোমা ও গোলাগুলিতে অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন—যার মধ্যে ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক (নারী, শিশু ও শ্রমিকসহ) এবং ১৫ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। সব মিলিয়ে একদিনের এই সহিংসতায় নিহতের সংখ্যা ১২৫-এর কাছাকাছি।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গি: আল জাজিরা, রয়টার্স, দ্য গার্ডিয়ান, বিবিসি, এপি সহ প্রধান মিডিয়াগুলো এই ঘটনাকে দীর্ঘদিনের বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তারা উল্লেখ করেছে যে, বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় কিন্তু সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ—খনিজ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবহেলা, অধিকারহরণ ও দারিদ্র্যের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভারত এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে আসছে।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মিডিয়া উইং ISPR এর বিবৃতি অনুসারে, প্রতিক্রিয়ায় নিরাপত্তা বাহিনী ৯২ জন সন্ত্রাসীকে হত্যা করেছে। এতে গত ৪৮ ঘণ্টায় মোট ১৩৩ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে (আগের দিন ৪১ জন)।

হামলাগুলো কোয়েটা (প্রাদেশিক রাজধানী), গোয়াদার, মাস্তুং, নুশকি, ডালবানদিন, খারান, পাঞ্জৌর, তুম্প ও পাসনি—এই ৯টির বেশি জেলায় একযোগে চালানো হয়েছে। লক্ষ্য ছিল পুলিশ স্টেশন, প্যারামিলিটারি ইনস্টলেশন, উচ্চ নিরাপত্তা কারাগার, সরকারি ভবন এবং বেসামরিক নাগরিকরা। নিষিদ্ধ বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (BLA) এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। BLA দাবি করেছে, তারা সামরিক ইনস্টলেশন, পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে গান অ্যাটাক ও আত্মঘাতী বোমা হামলা চালিয়েছে।

ISPR-এর বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই হামলাগুলো “ভারত-সমর্থিত” সন্ত্রাসীদের দ্বারা পরিচালিত হয়েছে (তারা ‘Fitna al-Hindustan’ বলে উল্লেখ করেছে)। বিদেশি মাস্টারদের নির্দেশে স্থানীয় জনগণের জীবন ও উন্নয়ন ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে এসব করা হয়েছে বলে দাবি। পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনী এই অভিযোগ বারবার করে আসছে, যদিও ভারত এসব অভিযোগ অস্বীকার করে।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মিডিয়া Reuters, Al Jazeera, The Guardian, BBC এই ঘটনাকে বেলুচ বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দীর্ঘদিনের বিদ্রোহের অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা দশকের পর দশক ধরে চলছে।

বেলুচিস্তান পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ হলেও সবচেয়ে দরিদ্র ও অবহেলিত। এখানে খনিজ সম্পদ থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় বেলুচ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ বিরাজমান। বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপগুলো (BLA, BLF ইত্যাদি) দাবি করে, তারা রিসোর্সের অধিকার ও স্বায়ত্তশাসন চায়। পাকিস্তান সরকার এদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে চিহ্নিত করে এবং বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশংসা করে বলেছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে। বেলুচিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী সরফরাজ বুগতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে জানিয়েছেন, অভিযান প্রায় শেষের দিকে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় (তুরস্ক, কাতারসহ) হামলার নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তানের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে।

এই ঘটনা বেলুচিস্তানের দীর্ঘদিনের অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। জনগণের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, এবং প্রশ্ন উঠছে—কীভাবে শান্তি ফিরিয়ে আনা যাবে? পাকিস্তান সরকারের দাবি অনুসারে বিদেশি ষড়যন্ত্র, নাকি স্থানীয় অভিযোগ অনুসারে অবহেলা ও অধিকারের লড়াই—এই বিতর্ক অব্যাহত।

দেশের জন্য উদ্বেগজনক এই সহিংসতা থামাতে সকল পক্ষকে সংযম ও সংলাপের পথে আসতে হবে। শান্তি ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব।