ভোটের মাসে উত্তাপ: বিএনপি-জামায়াতের আক্রমণাত্মক প্রচারণায় উদ্বেগ বাড়ছে

আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচনী মাঠে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোটের পাল্টাপাল্টি আক্রমণাত্মক প্রচারণায় বাড়ছে উদ্বেগ, আচরণবিধি প্রয়োগে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন।

বদিউল আলম লিংকন: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ নিয়ে গণভোট। দীর্ঘ ১৭ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, কারণ আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করছে না।

২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া প্রচারণায় বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোটের মধ্যে আক্রমণাত্মক বক্তব্য বাড়ছে, যা ভোটের পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলেছে। জনগণের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে যে, এই ধরনের উসকানি সংঘর্ষ বা অশান্তি ডেকে আনতে পারে।

বিএনপির পক্ষ থেকে জামায়াতের বিরুদ্ধে ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা, ধর্মের অপব্যবহার এবং নির্বাচনী কারচুপির অভিযোগ তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট বিএনপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব এবং ‘নব্য ফ্যাসিবাদ’র অভিযোগ করছে। উভয় পক্ষই একে অপরকে ‘বিদেশি আধিপত্য’র সঙ্গে যুক্ত করছে—বিএনপি জামায়াতকে পাকিস্তানপন্থী বলে অভিহিত করছে, জামায়াত বিএনপিকে ভারতপন্থী বলে। এ ধরনের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে জনমনে বিভাজন তৈরি করছে।

নির্বাচন কমিশন (ইসি) আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে নির্বিকার বলে সমালোচনা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, প্রতি উপজেলায় দুজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, প্রতি আসনে অনুসন্ধান ও বিচারিক কমিটি কাজ করছে এবং অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তথ্য অনুসারে, জানুয়ারির শুরু থেকে সাম্প্রতিক পর্যন্ত ১৪৪টির মতো লঙ্ঘনের ঘটনায় ৯৪টি মামলা হয়েছে এবং প্রায় ৯ লাখ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছে। তবে অনেকে মনে করেন, উসকানিমূলক বক্তব্য ও সহিংসতার বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ দরকার।

প্রচারণায় ধর্মীয় পরিভাষা ব্যবহার করে ভোট চাওয়া এবং নারী কর্মীদের বাড়ি বাড়ি যাওয়ার অভিযোগ নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ঢাকা-৮ আসনে জামায়াত-এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় উত্তেজনা বেড়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)সহ নাগরিক সংগঠনগুলো ধর্মের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আচরণবিধির ১৫ ধারা স্পষ্টভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ, অশালীন বক্তব্য ও ধর্মানুভূতিতে আঘাতকারী বক্তব্য নিষিদ্ধ করেছে।

প্রচারণা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা পর্যন্ত। ভোটগ্রহণ ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত। এবার ভোটের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে। সারাদেশে উত্তেজনা বিরাজমান হলেও জনগণ আশা করছে, ইসি নিরপেক্ষভাবে আচরণবিধি কঠোরভাবে প্রয়োগ করবে এবং সকল পক্ষ শান্তিপূর্ণভাবে প্রচার চালাবে।

এই নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। জনগণের দায়িত্ব হলো—কোনো ধরনের উসকানি বা বিভ্রান্তিতে না পড়ে সচেতনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করা। শান্তি ও গণতন্ত্র রক্ষায় সকলকে সতর্ক ও সংযত থাকতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনী মাঠে অংশগ্রহণকারী সব দলেরই দায়িত্ব রয়েছে আচরণবিধি মেনে শান্তিপূর্ণ প্রচার চালানোর। বিএনপি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনী পরিবেশের পক্ষে জোর দিয়ে প্রচার কার্যক্রম চালাচ্ছে বলে অনেকে মনে করেন। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোটও তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরে সমর্থন আদায়ের চেষ্টা চালাচ্ছে।

এ প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর তৎপরতার ওপরই নির্ভর করছে একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া।