গণভবনের পাশেই হবে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন

টুইট ডেস্ক: প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে একটি জায়গা চূড়ান্ত করেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। গণভবনের পাশেই নির্মাণ করা হবে এই বাসভবন। ইতোমধ্যে নকশা প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে স্থাপত্য অধিদপ্তর। নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর চূড়ান্ত মতামত নিয়ে ‘প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন’ তৈরির কাজ শুরু করতে চায় গণপূর্ত অধিদপ্তর।

তবে সেটি তৈরি হতেও দুই থেকে তিন বছর সময় লাগবে। সে সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা বা সংসদ ভবনসংলগ্ন স্পিকারের বাসভবনকে প্রধানমন্ত্রীর বাসস্থান হিসেবে নির্ধারণ করে রাখা হয়েছে। এটি নির্ভর করবে হবু প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের ওপর। তিনি চাইলে স্পিকারের বাসভবনের সঙ্গে লাগোয়া ডেপুটি স্পিকারের বাসভবনকেও যুক্ত করে দেওয়া হবে।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের পরই দেশের মানুষ নতুন প্রধানমন্ত্রী পাবেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে শেরেবাংলা নগরের ‘গণভবন’ নির্ধারিত ছিল। জুলাই অভ্যুত্থানের পর সেটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গণভবনকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে তৈরির উদ্যোগ নেয়। জাদুঘর তৈরির কাজ শেষের পথে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবন যে এলাকায় নির্মিত হচ্ছে, তাতে সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের নকশায় কোনো ব্যত্যয় হবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে এ ব্যাপারে স্থাপত্য অধিদপ্তরের দায়িত্বশীলরা কিছু বলতে চাননি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৬২ সালে সংসদ ভবনসহ একটি পরিকল্পিত এলাকা গড়ে তোলার নকশা প্রণয়নের জন্য মার্কিন স্থপতি লুই আই কানকে শেরেবাংলা নগরে ২০৮ একর জমি দেওয়া হয়। ১৯৭৩ সালে তিনি এই নকশা চূড়ান্ত করেন। তবে সংসদ ভবন নির্মাণের আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরে সংসদ ভবন কমপ্লেক্সের নকশাকে নানাভাবে অবজ্ঞা করে স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। যে স্থানটি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে, সেখানে লুই আই কানের নকশায় কী উল্লেখ ছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। উইকিপিডিয়া ও সংসদ ভবনবিষয়ক তথ্যাবলিতেও সেটার উল্লেখ নেই। তবে অতীতে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সংসদ ভবনের আশপাশের এলাকায় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাসস্থান, হাসপাতাল, লেক, সবুজের সমারোহ, প্রশস্ত সড়ক ইত্যাদি থাকার প্রত্যাশা ছিল লুই আই কানের।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণ ঘিরে গণপূর্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি করা হয়েছে। গণপূর্ত অধিদপ্তর, স্থাপত্য অধিদপ্তর, কারিগরি পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধি, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞদের কমিটিতে রাখা হয়েছে। কমিটির দুটি সভায় প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কোথায় হবে এবং বাসভবন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী কোথায় থাকবেন- এ দুটি বিষয় বেশি গুরুত্ব পায়। প্রধানমন্ত্রীর জন্য স্থায়ী বাসভবনের জায়গার বিষয়ে তিনটি স্থান আলোচনায় আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মত আসে গণভবনের পশ্চিম-উত্তর পাশে থাকা একটি জায়গা, যেটির অবস্থান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস লাগোয়া। সেখানে প্রায় ১৮ একর জমি রয়েছে। ওই জমির একাংশে সরকারি কর্মচারীদের পুরোনো কোয়ার্টার রয়েছে।

এ ছাড়া বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পাশের উন্মুক্ত স্থান এবং আগারগাঁও-শ্যামলী সড়কের দক্ষিণ পাশে সংসদ ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের পুরোনো কোয়ার্টার ভেঙে সেখানে বাসভবন তৈরির প্রস্তাব আসে। পরে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণের জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিসসংলগ্ন জায়গাটি চূড়ান্ত করেন কমিটির সদস্যরা।

কমিটির সদস্য স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, আমরা নকশার কাজ শুরু করেছি। আগেভাগেই এটি করে রাখতে চাই, যাতে নতুন সরকার আসার পরই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণের কাজটা গণপূর্ত অধিদপ্তর শুরু করতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জন্য যে স্থান নির্বাচন করা হয়েছে, সেখানে আগের গণভবনের মতোই জায়গা রয়েছে। ওই জমির পুরোটা নিয়ে নকশা তৈরি করা হচ্ছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর যা যা প্রয়োজন হয়, এর সবকিছুই সেখানে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। মূল ভবনটি হবে তিনতলা।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী কাজী ফিরোজ হাসান বলেন, সেখানে যেহেতু বহুতল ভবন হবে না, কাজেই দুই থেকে আড়াই বছরের মধ্যে বাসভবন নির্মাণ সম্ভব।

স্বাধীনতার পর থেকে গণভবন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তখনও এটির নাম ছিল গণভবন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হলে তিনি সেখানে বাস শুরু করেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ২০০১ সালের ২ জুলাই বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্য হিসেবে শেখ হাসিনাকে ১ টাকা প্রতীকী মূল্যে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য গণভবন বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা ছাড়লে সেই বরাদ্দ বাতিল করে সরকার। তবে খালেদা জিয়া ফের প্রধানমন্ত্রী হলেও তিনি গণভবনকে তাঁর বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করেননি। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে শেখ হাসিনা আবারও গণভবনে ওঠেন। ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালানোর সময় পর্যন্ত তিনি ওই গণভবনেই বাস করেন। পালানোর দিন বিক্ষুব্ধ হাজার হাজার মানুষ গণভবনে আক্রমণ, লুটপাট ও ভাঙচুর করে। পরে অন্তর্বর্তী সরকার সেটিকে ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়।

বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন

এদিকে, গত বছর ৫ আগস্ট জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধন করা হবে বলে সরকারের তরফে জানানো হয়েছিল। পরে তা স্থগিত করে নভেম্বর ও ডিসেম্বরে দুই দফা উদ্বোধন করার কথা থাকলেও কাজ শেষ না হওয়ায় সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ সরকারের পক্ষ থেকে গত ২০ জানুয়ারি জুলাই স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের কথা জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাও হয়নি। তবে ওই দিন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাদুঘরের কাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন।

সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী জানান, জাদুঘর উদ্বোধনের দিনক্ষণ ঠিক হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের সময়েই জাদুঘরের কাজ সম্পন্ন হবে।