সার্ভিকাল ক্যান্সার: পরীক্ষা ও টিকাদানই নারীর জীবন রক্ষার চাবিকাঠি

ছবি: চিকিৎসকরা মনে করেন যে নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং এইচপিভি টিকাদানের মাধ্যমে জরায়ুমুখের ক্যান্সার অত্যন্ত প্রতিরোধযোগ্য। (ছবিটি কেবল উপস্থাপনের উদ্দেশ্যে)

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত স্ক্রিনিং, এইচপিভি টিকাদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশের নারীরাও সার্ভিকাল ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে পারে।

টুইট প্রতিবেদন: সার্ভিকাল ক্যান্সার, যা নারীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রতিরোধযোগ্য ক্যান্সারগুলোর একটি, বাংলাদেশেও গুরুত্ব সহকারে প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, নিয়মিত পরীক্ষা, এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস) টিকাদান এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই রোগকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) অভিজ্ঞতা দেখিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার সনাক্তকরণ এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করলে জীবন বাঁচানো সম্ভব। ইউএইতে সম্প্রতি এক ৪০ বছর বয়সী ব্রিটিশ প্রবাসী নারীর প্রাথমিক পর্যায়ের জরায়ুমুখের টিউমার সফলভাবে অপসারণ করা হয়েছে। এমআরআই ও পিইটি-সিটি স্ক্যান নিশ্চিত করেছে যে ক্যান্সারটি জরায়ুর বাইরে ছড়ায়নি। রোগীর উচ্চ বিএমআই থাকা সত্ত্বেও ওপেন র‌্যাডিক্যাল হিস্টেরেক্টমি সম্পন্ন হয়েছে এবং ৪০টি লিম্ফ নোড ক্যান্সারমুক্ত ছিল। ফলে কোনো কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়নি।

ড. জাফারু আবু বলেন, “এই কেস প্রমাণ করে প্রাথমিক সনাক্তকরণ, টিকাদান এবং বিশেষায়িত ক্যান্সার কেয়ারের গুরুত্ব। উন্নত ইমেজিং, সার্জারি এবং মাল্টিডিসিপ্লিনারি টিমের সমন্বয়ে জটিল কেসেও ফলাফল উন্নত হচ্ছে।”

ড. মারিয়া আনসারি, ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিক আবুধাবির মেডিক্যাল অনকোলজিস্ট বলেন, “সার্ভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধযোগ্য। হাই-রিস্ক এইচপিভি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নারীরা জীবন রক্ষা করতে পারেন।”

বাংলাদেশের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ-

এইচপিভি টিকাদান সম্প্রসারণ

স্কুল ও কমিউনিটি ক্লিনিকে সহজলভ্য টিকাদান নিশ্চিত করা। বিশেষত ৯-১৪ বছর বয়সী মেয়েদের টিকাদান বাড়াতে হবে।

নিয়মিত স্ক্রিনিং

ঝুঁকিপূর্ণ বয়সী নারী ও প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্যাপ স্মিয়ার এবং এইচপিভি টেস্টিং প্রোগ্রাম চালু করা। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সার সনাক্ত হলে সহজেই সার্জারি ও চিকিৎসার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

সচেতনতা বৃদ্ধি

মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্কুল এবং কমিউনিটি ওয়ার্কশপের মাধ্যমে সার্ভিকাল ক্যান্সার ও এইচপিভি সংক্রমণ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। পরিবার ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা, যাতে নারীরা সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত হন।

বিশেষায়িত চিকিৎসা কেন্দ্র

বড় শহরে গাইনোকোলজিক্যাল অনকোলজি কেন্দ্র গঠন করে মাল্টিডিসিপ্লিনারি কেয়ারের মাধ্যমে উন্নত চিকিৎসা প্রদান। সার্জারি, কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির সমন্বয়ে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা নিশ্চিত করা।

ডেটা ও গবেষণা

সার্ভিকাল ক্যান্সারের জাতীয় রেজিস্ট্রি তৈরি করে হাই-রিস্ক এইচপিভি সংক্রমণ ও চিকিৎসার ফলাফল পর্যবেক্ষণ করা। এটি নীতি নির্ধারণ ও প্রোগ্রাম উন্নয়নে সহায়ক হবে।

বিশেষজ্ঞরা আরোও বলেন, “নিয়মিত পরীক্ষা, টিকাদান এবং সচেতনতা নারীদের জীবন রক্ষায় সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। বাংলাদেশেও ইউএই-এর মতো উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে সার্ভিকাল ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।”

বাংলাদেশে নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান সম্প্রসারণ ও আধুনিক চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে সার্ভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধে নতুন দিগন্ত উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যদি দেশব্যাপী নিয়মিত টিকাদান ও স্ক্রিনিং প্রোগ্রাম কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, প্রায় ৮০–৯০ শতাংশ নারী সার্ভিকাল ক্যান্সার থেকে রক্ষা পেতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা মতে, সার্ভিকাল ক্যান্সার প্রতিরোধ শুধুমাত্র চিকিৎসা নয়, এটি সম্প্রদায় ও পরিবারভিত্তিক সচেতনতার ফলাফল। পরিবার, শিক্ষক, চিকিৎসক ও স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা একযোগে কাজ করলে নারীর জীবন রক্ষা সম্ভব। সমাজের সব স্তরে সচেতনতা ও সহযোগিতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে নারীর স্বাস্থ্য রক্ষা এবং মানব কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।