কাশ্মীর ইস্যুতে হস্তক্ষেপের আশঙ্কা: ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ থেকে দূরে ভারত

ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন নতুন শান্তি উদ্যোগে যোগ দিতে অনীহা; আন্তর্জাতিক নজরদারি ও কাশ্মীর মধ্যস্থতার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন নয়াদিল্লি
টুইট প্রতিবেদক: যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে গঠিত নতুন আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘বোর্ড অব পিস’-এ যোগ দেওয়ার বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি ভারত। সম্প্রতি দাভোসে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্পসহ ২০ জন বিশ্বনেতা বোর্ডটির সনদে স্বাক্ষর করেন, যাদের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফও ছিলেন।
তবে ওই আয়োজনে ভারতের অনুপস্থিতি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ভারতের এই অনীহার পেছনে মূলত কাশ্মীর ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বা মার্কিন মধ্যস্থতার আশঙ্কাই বড় কারণ বলে মনে করছেন দেশটির কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অতীতেও একাধিকবার কাশ্মীর বিরোধে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছেন, বিশেষ করে ২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির পর। তবে নয়াদিল্লি বরাবরই এ ধরনের প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এসেছে।
দাভোসে ট্রাম্প বলেন, ‘বোর্ড অব পিস’-এর মূল লক্ষ্য গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে অস্ত্রবিরতিকে স্থায়ী রূপ দেওয়া এবং সেখানে একটি অন্তর্বর্তী সরকার তদারকি করা। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, এ উদ্যোগ কেবল গাজায় সীমাবদ্ধ না থেকে ভবিষ্যতে বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতপূর্ণ এলাকাতেও প্রয়োগ করা যেতে পারে।
এই বক্তব্যই ভারতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। দেশটির বিভিন্ন মহলে আশঙ্কা, ট্রাম্প যেভাবে নিজেকে বৈশ্বিক ‘শান্তির দূত’ হিসেবে তুলে ধরছেন, তাতে ভবিষ্যতে কাশ্মীর প্রশ্নও তার শান্তি পরিকল্পনার আওতায় আসতে পারে। ভারতের প্রভাবশালী দৈনিক দ্য হিন্দু এক সম্পাদকীয়তে পাকিস্তানের বোর্ডে যোগদানকে ভারতের জন্য ‘সতর্ক সংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়, ট্রাম্প যদি কাশ্মীর ইস্যুকে তার শান্তি পরিকল্পনার অংশ করেন, তবে বোর্ড অব পিস তা ‘সমাধানের’ চেষ্টা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে বোর্ডে যোগ দিলে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েনের বিরোধিতাও ভারতের পক্ষে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
বিবিসি হিন্দির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন এক সময়ে বোর্ড অব পিস গঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে জাতিসংঘের একাধিক সংস্থা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করছে। এতে প্রশ্ন উঠেছে, এই নতুন প্ল্যাটফর্ম কি আদতে জাতিসংঘকে দুর্বল বা অপ্রাসঙ্গিক করে তোলার উদ্দেশ্যেই তৈরি হচ্ছে? পাশাপাশি আশঙ্কা রয়েছে, এটি যুক্তরাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত একমেরু বিশ্বব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ভারতের সাবেক জাতিসংঘ প্রতিনিধি সৈয়দ আকবরুদ্দিন টাইমস অব ইন্ডিয়া-তে লেখা এক নিবন্ধে উল্লেখ করেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বোর্ড অব পিসের মেয়াদ ২০২৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সীমিত এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর নিরাপত্তা পরিষদে রিপোর্ট দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তাঁর মতে, এটি যাতে স্থায়ী বৈশ্বিক মডেলে পরিণত না হয়, সেজন্যই এই শর্ত। তবে ট্রাম্পের প্রস্তাবিত শান্তি কাঠামোয় এমন কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই এবং এটি গাজার বাইরে অন্য অঞ্চলেও প্রয়োগ করা হতে পারে।
ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত রঞ্জিত রায় বলেন, বোর্ড অব পিসে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া — উভয় ক্ষেত্রেই ভারতের জন্য ঝুঁকি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, “ভারতের দোটানা বেড়েছে। যোগ দিলেও প্রভাব পড়বে, না দিলেও পড়বে। তবে বোর্ডে যোগ দেওয়ার ঝুঁকি বেশি। কারণ ট্রাম্প এর চেয়ারম্যান, আর তার লেনদেনভিত্তিক কূটনীতি থেকে ন্যায়বিচার আশা করা কঠিন।”
তিনি আরও বলেন, বোর্ডে সদস্যদের সমান মর্যাদা থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মতো ‘এক দেশ, এক ভোট’ নীতি এখানে কার্যকর হবে কি না, সে বিষয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন এবং চলমান বাণিজ্য আলোচনাও ভারতের নীরব অবস্থানের পেছনে ভূমিকা রাখছে। ট্রাম্পের আমন্ত্রণ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলে ওয়াশিংটনের অসন্তোষের মুখে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না নয়াদিল্লি।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’ ভারতের সামনে এক জটিল কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে , যেখানে অংশগ্রহণ ও দূরত্ব, দুটোরই সম্ভাব্য মূল্য চুকাতে হতে পারে।






