১০ কোটি বছর পর সক্রিয় হয়ে উঠেছে দানবাকৃতির ব্ল্যাকহোল
টুইট ডেস্ক: সম্প্রতি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এক বিশাল ব্ল্যাকহোলের সন্ধান পেয়েছেন। যেটি প্রায় ১০ কোটি বছর ধরে নীরব ছিল। হঠাৎ করে এটি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। দীর্ঘ ঘুমের পর এটি জেগে উঠে চারপাশে ছুড়ে দিচ্ছে প্রচণ্ড শক্তির রেডিও জেট। মহাকাশীয় বস্তু থেকে নির্গত কণা ও তড়িৎ–চৌম্বকীয় বিকিরণের উচ্চগতির প্রবাহকে বলে রেডিও জেট।
ব্ল্যাকহোলটি অবস্থান করছে একটি দৈত্যাকার গ্যালাক্সির কেন্দ্রে। দৃশ্যমান আলোতে গ্যালাক্সিটি দেখতে সাধারণ হলেও রেডিও টেলিস্কোপে তোলা ছবিতে ধরা পড়েছে ভিন্ন চিত্র। এতে দেখা গেছে লাল আভাযুক্ত বিশাল রেডিও তরঙ্গের জেট। এই জেট ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্র থেকে লাখ লাখ আলোকবর্ষ দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি একধরনের ‘পুনর্জন্ম’। একটি দানবীয় ব্ল্যাকহোল নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে।
ব্ল্যাকহোল মানেই যে কেবল সবকিছু গিলে খাবে, ঘন কালো বা অন্ধকার বস্তু, এমন নয়। অনেক সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের চারপাশে থাকে ধুলা, গ্যাস ও প্লাজমার ঘূর্ণায়মান অ্যাক্রিশন ডিস্ক। এই ডিস্ক থেকে তৈরি হয় শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্র, যা কিছু বস্তুকে ব্ল্যাকহোলের ভেতরে টেনে নেয়, কিছু বস্তুকে অবিশ্বাস্য গতিতে বাইরে ছুড়ে দেয়। সেই বেরিয়ে আসা বস্তুই তৈরি করে বিশাল জেট। রেডিও তরঙ্গে এই জেট উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তবে সব সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাকহোল এমন আচরণ করে না। মাত্র ১০ থেকে ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে এ ধরনের রেডিও জেট দেখা যায়।
এই গবেষণায় বিজ্ঞানীরা চোখ দিয়েছেন একটি বিশেষ গ্যালাক্সির দিকে, যার নাম জে১০০৭+৩৫৪০। নেদারল্যান্ডস–ভিত্তিক শক্তিশালী রেডিও টেলিস্কোপ নেটওয়ার্ক লোফার ব্যবহার করে গ্যালাক্সিটির ভেতরের অদ্ভুত কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, গ্যালাক্সিটির চারপাশে রয়েছে বিশাল ও ঝাপসা প্লাজমার দুটি ধারা। এটি ইঙ্গিত দেয় যে বহু আগে এই ব্ল্যাকহোল একবার প্রবল শক্তিতে সক্রিয় হয়েছিল। হিসাব অনুযায়ী, প্রাচীন জেটগুলোর বয়স প্রায় ২৪ কোটি বছর।
পুরোনো ও ক্ষীণ লোবগুলোর ভেতরে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন নতুন, উজ্জ্বল ও তুলনামূলক ছোট জেট, যেগুলোর বয়স আনুমানিক ১৪ কোটি বছর। মানে মাঝখানে দীর্ঘ সময় ব্ল্যাকহোলটি কার্যত নীরব ছিল। তারপর কোনো এক অজানা কারণে এর কেন্দ্রীয় শক্তি উৎপাদনব্যবস্থা আবার চালু হয়েছে। এ ঘটনাকে বিজ্ঞানীরা বলছেন ‘এপিসোডিক এজিএন’, অর্থাৎ গ্যালাক্সির কেন্দ্রীয় ইঞ্জিন সময়ে সময়ে বন্ধ হয়ে আবার সক্রিয় হয়।
ভারতের মেদিনীপুর সিটি কলেজের জ্যোতির্বিজ্ঞানী শোভা কুমারীর ভাষায়, এই দৃশ্য যেন ‘দীর্ঘ শান্তির পর জেগে ওঠা এক মহাজাগতিক আগ্নেয়গিরি’। তবে এমন আগ্নেয়গিরি, যার বিস্ফোরণ প্রায় দশ লাখ আলোকবর্ষজুড়ে কাঠামো গড়ে তুলতে পারে। বাস্তবেও এসব জেট আশপাশের মহাকাশকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
জে১০০৭+৩৫৪০ যে গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের অংশ, তার ভেতরের ফাঁকা অঞ্চল আছে অত্যন্ত উত্তপ্ত গ্যাসে, যাকে বলা হয় ‘ইন্ট্রাক্লাস্টার মিডিয়াম’। এই গ্যাসের সঙ্গে ব্ল্যাকহোলের জেটগুলোর সংঘর্ষে কোথাও জেট বেঁকে গেছে, কোথাও আবার চ্যাপটা হয়ে নিজের উৎসের দিকে ফিরে এসেছে।
বিজ্ঞানীদের কাছে এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে তাঁরা বুঝতে পারবেন, একটি ব্ল্যাকহোল কত ঘন ঘন ‘ঘুমিয়ে পড়ে’ এবং কত সময় পর আবার জেগে ওঠে। পাশাপাশি জানা যাবে, পুরোনো ও নতুন জেট আশপাশের গ্যাসের সঙ্গে কীভাবে পারস্পরিক ক্রিয়া করে। ভবিষ্যতে আরও সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এই গ্যালাক্সির ভেতরের শক্তির বিস্তারিত মানচিত্র আঁকার পরিকল্পনাও রয়েছে বিজ্ঞানীদের।






