ঢাকার ৪ আসনে দলীয় প্রধানদের মর্যাদার লড়াই

টুইট ডেস্ক: জাতীয় নির্বাচনে সাধারণত রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধানরা ঢাকায় নির্বাচন করতে তেমন আগ্রহী থাকেন না। নিরাপদ জয় নিশ্চিত করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের জন্মস্থান বা নিজ নিজ এলাকার আসন বেছে নেন। অতীতে দু-একটি নির্বাচনে ঢাকার আসনগুলোতে হাতে গোনা কয়েকজন দলীয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কারও কারও পরাজয়ের নজির রয়েছে।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে এবার ঢাকার চারটি আসনে চারটি দলের প্রধান ভোটযুদ্ধে নেমেছেন, যা জাতীয় রাজনীতিতে বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাকা-১৭ (গুলশান, বনানী ও ভাসানটেক) আসন থেকে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান, ঢাকা-১৫ (কাফরুল) আসন থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান, ঢাকা-১১ (রামপুরা, বাড্ডা ও ভাটারা) আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর ও আদাবর) আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক নির্বাচন করছেন।
চারটি প্রধান দলের শীর্ষ নেতাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে সারাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের নজর এখন এই চারটি আসনের দিকে। ঢাকার আসনে দলীয় প্রধানের জয় বা পরাজয়কে রাজনৈতিকভাবে ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’ হিসেবেই দেখা হয়। ফলে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। কারণ অতীতে ঢাকার আসন থেকে দলীয় প্রধানদের পরাজয়ের রেকর্ড রয়েছে।
ঢাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী দলীয় প্রধানরা
ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রার্থিতা ঘোষণার পর থেকেই এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন নেতাকর্মীরা। গত ২৭ ডিসেম্বর প্রার্থিতার ঘোষণা দেওয়ার পর তারেক রহমান বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেছেন। যদিও এর আগে এই আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে গণসংযোগ করছিলেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ। পরে তারেক রহমানের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হলে তিনি ভোলা-১ আসনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন।
এই আসনে তারেক রহমানের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামান। তিনিও দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রচারণা চালিয়ে আসছেন।
ঢাকা-১৫ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি গত কয়েক বছর ধরে এই এলাকায় নিয়মিত প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। সর্বশেষ, ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে আওয়ামী লীগের কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে পরাজিত হন। এবার তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা শফিকুল ইসলাম মিল্টন।
ঢাকা-১১ আসনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। যদিও শুরুতে এই আসনে তার প্রচারণা তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এ আসনে দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। তবে গত ২৮ জুন এনসিপি জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার পর তিনি নির্বাচন থেকে সরে গিয়ে নাহিদ ইসলামকে সমর্থন দেন। বর্তমানে জামায়াতের জনশক্তি নিয়ে মাঠে প্রচারণা চালাচ্ছেন নাহিদ ইসলাম। এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক ড. এম এ কাইয়ুম।
ঢাকা-১৩ আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। তার পক্ষে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসেন প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীও তার সম্মানে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। এই আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এনডিএম-এর চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। প্রতীক বিধিমালা অনুযায়ী তিনি নিজ দল থেকে পদত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দেন।
অতীতে ঢাকায় দলীয় প্রধানদের হার-জয়ের রেকর্ড
ঢাকার আসনে অতীতে বড় দলগুলোর প্রধানদের জয় ও পরাজয়ের দুই ধরনের নজিরই রয়েছে। ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা ঢাকার দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে উভয় আসনেই পরাজিত হন। ঢাকা-১০ আসনে তিনি বিএনপির আব্দুল মান্নানের কাছে এবং ঢাকা-৭ আসনে বিএনপির ছাদেক হোসেন খোকার কাছে পরাজিত হন।
অন্যদিকে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ জয় লাভ করেন। তিনি ওই নির্বাচনে এক লাখ ২৩ হাজার ৯৩৬ ভোট পেয়ে জয়ী হন।
২০১৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের ডা. শফিকুর রহমান ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর কাছে হেরে যান। এবার তিনি নিজ দলীয় প্রতীক দাঁড়িপাল্লা নিয়ে নির্বাচন করছেন।
এর বাইরে ঢাকার আসনে বড় দলগুলোর প্রধানদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার উল্লেখযোগ্য রেকর্ড খুব বেশি নেই বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মত
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)-এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, অতীতে ঢাকায় বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতাদের পরাজয়ের নজির রয়েছে। তার মতে, এবারই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দলীয় প্রধান ঢাকার আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তিনি বলেন, ঢাকার আসনে দলীয় প্রধানের পরাজয় ইমেজ সংকট তৈরি করতে পারে বলেই সাধারণত নেতারা ‘সেফ জোন’ বেছে নেন। তবে এবারের রাজনৈতিক সমীকরণ কী দাঁড়ায়, তা বিশ্লেষণ সাপেক্ষ। অতীতে ভোটারদের আঞ্চলিক সমীকরণ ও গণজোয়ারের কারণেই অনেক ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। এবারও সেই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয় কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।






