আর কত লোক পঙ্গু হলে বন্ধ হবে সীমান্তের মাইন বিস্ফোরণ?

অসীম রায় (অশ্বিনী), বান্দরবান: বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম ইউনিয়নের তমব্রু হেডম্যানপাড়া। সীমান্ত সড়ক ঘেঁষে ছোট একটি মনিহারি দোকান। দোকান থেকে মাত্র ৩০০ গজ দূরেই স্পষ্ট দেখা যায় মিয়ানমার সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া। পেছনে ঢেউ খেলানো পাহাড়, নিচে বিস্তীর্ণ ধানের খেত।
দোকানের সামনে ছড়িয়ে রাখা পান-সুপারি, ভেতরে রংচঙে বিস্কুট, সয়াবিন তেলের ছোট বোতল আর ১০ টাকার গুঁড়া দুধের প্যাকেট। বসে বসেই ক্রেতা সামলাচ্ছেন সুদর্শন এক যুবক। বয়স বড়জোর ৩০। তাঁর পাশে দোকানের মালপত্রের গায়ে হেলান দেওয়া এক জোড়া ক্রাচ।
দোকানির নাম অন্তাই তঞ্চঙ্গ্যা। বসে দোকান চালানোর কারণ-মিয়ানমার সীমান্তে পুঁতে রাখা ভূমিমাইনের বিস্ফোরণে তাঁর বাঁ পা উড়ে গেছে।
জুমচাষি থেকে প্রতিবন্ধী দোকানদার-
২০২৩ সালের এপ্রিল মাস। পাহাড়ি উৎসব বিজুর সময়। জুমের জমিতে কাজ করতে গিয়েছিলেন অন্তাই। হঠাৎ এক বিকট বিস্ফোরণ। এরপর আর কিছু মনে নেই। দীর্ঘদিন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ক্রাচে ভর দিয়ে বাড়ি ফেরেন। ফিরে বুঝতে পারেন-জীবন আর আগের মতো নেই।
জুমচাষ আর সম্ভব নয়। তাই ধারদেনা করে সীমান্ত সড়কের পাশে ছোট এই দোকানটি দেন তিনি।
অন্তাই জানান, চিকিৎসা খরচ হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা। দোকান দিতে লেগেছে আরও ৭০ হাজার টাকা। সরকার থেকে পেয়েছেন মাত্র ২০ হাজার টাকা। স্ত্রী ও ছয় বছরের একটি সন্তান নিয়ে এখন তাঁর দিন কাটে অনিশ্চয়তায়।
বিদায়ের সময় পেছন থেকে ডেকে প্রশ্ন করেন অন্তাই-“সরকারের কাছে একটু জানতে চাইবেন, আর কত লোক পঙ্গু হলে মাইন বিস্ফোরণ বন্ধ হবে?”
এক পা হারিয়ে অটোরিকশার স্টিয়ারিংয়ে জীবন-
অন্তাইয়ের বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে বাইশারি এলাকায় দেখা মেলে পিয়ারা তঞ্চঙ্গ্যার সঙ্গে। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে খেতে কাজ করতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে বাঁ পা হারান তিনি। কৃষক থেকে বাধ্য হয়ে এখন অটোরিকশাচালক।
পিয়ারা বলেন, “সব দিন চালাতে পারি না। বেশি পরিশ্রম করলে শরীর ব্যথায় ভেঙে পড়ে। তাঁর স্ত্রী লাকি তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, তিন সন্তান নিয়ে খুব কষ্টে আছি। সংসার চালানো কঠিন হয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ, বাড়ছে আতঙ্ক-
গত সোমবার টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকায় নাফ নদীসংলগ্ন সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে বাঁ পা হারান জেলে মোহাম্মদ হানিফ। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এই ঘটনার পর নাইক্ষ্যংছড়ি, উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত এলাকার মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
পরিসংখ্যান বলছে ভয়াবহ বাস্তবতা-
অনলাইন ও দৈনিক পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মিয়ানমার সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে অন্তত ২৭ জন পঙ্গু হয়েছেন। বেশিরভাগ ঘটনা ঘটেছে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে। কেউ খেতে কাজ করতে গিয়ে, কেউ গরু-ছাগল আনতে গিয়ে পা হারিয়েছেন।
ল্যান্ডমাইন মনিটর ২০২৪-এর ভয়ংকর তথ্য-
ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ব্যান ল্যান্ডমাইনস (আইসিবিএল) প্রকাশিত ল্যান্ডমাইন মনিটর ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়-
২০২৩ সালে মিয়ানমারে ভূমিমাইনে হতাহত হয়েছেন ১,০০৩ জন সিরিয়ায় একই সময়ে নিহত ও আহত হন ৯৩৩ জন। মিয়ানমার এখনো জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে সই করেনি। দেশটির সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিমাইন ব্যবহার বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনের বক্তব্য-
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শামীম আরা রিনি ও কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, সীমান্তে গোলাগুলি ও মাইন বিস্ফোরণ বন্ধে সরকারের উচ্চপর্যায়ে মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
পা নেই, কাজও নেই-ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত-
২০২৪ সালের জুনে গরু আনতে গিয়ে মাইন বিস্ফোরণে ডান পা হারান নবী হোসেন (২০)। চিকিৎসার পর একটি এনজিও তাঁকে কৃত্রিম পা দিলেও ভারী কিছু বহন করতে পারেন না। কাজ নেই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।
২০২০ সালে মাইন বিস্ফোরণে পা ক্ষতবিক্ষত হয় আবদুল মালেকের। পাঁচ বছরেও স্বাভাবিক হননি। সংসার চলে মানুষের সাহায্যে।
বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি, কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্তে পা হারানো মানুষগুলোর জীবন এখন কেবল টিকে থাকার লড়াই।







