জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাব হত্যাকাণ্ড: সন্ত্রাসী ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘোষণা

দম্ভের চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে সন্ত্রাসীদের। একা‌ধিক গ্রুপের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানের প্রস্তুতি, জঙ্গল সলিমপুর ঘিরে সতর্কতা।

বিশেষ প্রতিবেদন: চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি এলাকা জঙ্গল সলিমপুরে র‍্যাবের ওপর সংঘটিত ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জোরদার করা হয়েছে। হামলায় নিহত র‍্যাব-৭–এর উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) মো. আব্দুল মোতালেব হোসেন ভূঁইয়ার ঘটনায় এলাকাজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।

র‍্যাব ও পুলিশ সূত্র জানায়, সোমবার (১৯ জানুয়ারি ২০২৬) সন্ধ্যায় অস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী গ্রেপ্তার অভিযানে অংশ নেওয়া একটি র‍্যাব দল পরিকল্পিত ও সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয়। এতে তিনজন র‍্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন, যাদের চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

র‍্যাব সূত্রে জানা যায়, অভিযানে অংশ নেয় প্রায় ৫০ সদস্যের একটি দল। একজন সশস্ত্র সন্ত্রাসীকে গ্রেপ্তারের পর ফেরার পথে মাইকে ঘোষণা দিয়ে ৪০০–৫০০ জনকে জড়ো করে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা র‍্যাব সদস্যদের ওপর ইট-পাটকেল ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে, অস্ত্র ছিনিয়ে নেয় এবং গুলি চালায়। একপর্যায়ে পিটিয়ে ও গুলিতে ডিএডি মোতালেব হোসেন ভূঁইয়াকে হত্যা করা হয়। আহত র‍্যাব সদস্যদের চট্টগ্রামের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি করা হয়েছে।

স্থানীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র অনুযায়ী, এ হামলার পেছনে ইয়াসিন গ্রুপের অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এই সন্ত্রাসী গ্রুপটি ভূমি দখল, পাহাড় কাটা, অবৈধ বসতি স্থাপন, চাঁদাবাজি ও অস্ত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে আসছে। গ্রুপটির প্রধান নেতা ইয়াসিন মিয়া—নোয়াখালীর সেনবাগ উপজেলার কেশারপাড়া এলাকার বাসিন্দা—কয়েক বছর আগে চট্টগ্রামে এসে আলীনগর এলাকায় অবস্থান নিয়ে সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি ‘স্বঘোষিত রাজা’ হিসেবে পরিচিত।

২০২২ সালের জুলাই মাসে ইয়াসিন মিয়াকে গ্রেপ্তার করা হলেও তার গ্রুপের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বর্তমানে কালাইয়াসিন, নুরুল হক ভান্ডারী, ওমর ফারুক, কাজী ফারুকসহ একাধিক সহযোগী নেতৃত্বে গ্রুপটি সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ।

সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য জঙ্গল সলিমপুর

জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই সন্ত্রাসী ও ভূমিদস্যুদের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত। সরকারি খাসজমিতে পাহাড় কেটে অবৈধভাবে বসতি গড়ে তোলা হয়েছে। অতীতে আলী আক্কাস, মশিউর রহমানসহ একাধিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দখলে ছিল এলাকাটি। বর্তমানে ইয়াসিন গ্রুপের পাশাপাশি রুকন গ্রুপসহ আরও কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এখানে সক্রিয়। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য এলাকাটি বরাবরই চ্যালেঞ্জিং।

র‍্যাবের কঠোর বার্তা ও সমন্বিত অভিযান

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি ২০২৬) নিহত র‍্যাব কর্মকর্তার জানাজা শেষে র‍্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহীদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, “রাষ্ট্রের চেয়ে সন্ত্রাসীরা বড় নয়। জঙ্গল সলিমপুরের অবৈধ আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে। খুব শিগগিরই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের নির্মূল করা হবে।”

তিনি জানান, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, এপিবিএন ও জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে বৃহৎ যৌথ অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে সরকারি জমি উদ্ধার, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং সন্ত্রাসীদের রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে।

এ ঘটনায় চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত, টেকসই ও নিরবচ্ছিন্ন অভিযানই পারে জঙ্গল সলিমপুরকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।