জাইমা রহমান: চমকপ্রদ সূচনার মতোই বহমান হোক আগামীর পথচলা

টুইট ডেস্ক: নারীশক্তির বিজয়ের যে অগ্রযাত্রা সারা বিশ্বে বহমান, বাংলাদেশেও সেই স্রোতোধারা বহমান। এই জনপদের নারীদের আশা আকাঙ্ক্ষার বাতিঘর হয়ে আলো দিয়ে গেছে মানুষের হৃদয়ের কাছের এক পরিবার ‘জিয়া পরিবার’ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যেই অগ্রযাত্রার বীজ বপন করেছিলেন, সেই যাত্রায় সারথি হয়েছেন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
তিনি নিজে রাজপথে নেমে সেই যাত্রার সঙ্গী হয়েছেন, দেশের দায়িত্ব নিয়ে নারীদের বুকের মাঝে লুকায়িত স্বপ্নের সাথে আলিঙ্গন করিয়েছেন। প্রজন্মের ধারাবাহিকতায় জিয়া পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্মের দায়িত্ব নিয়েছেন তারেক রহমান। গতকাল জিয়া পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে জনতার সামনে এলেন তারেক রহমান কন্যা জাইমা রহমান।
গতকাল ‘উইমেন শেপিং দ্যা নেশন’ নামের একটি অনুষ্ঠানে জাইমা রহমান বক্তব্য রেখেছেন। মানুষের উদ্দেশ্যে কথা বলার সূচনা হয়েছে এক চমকপ্রদ বিষয়ের মধ্য দিয়ে। রাজনৈতিক প্রথাগত কোনো জনসভায় তিনি বক্তব্য রাখেননি, তিনি যে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কথা বলার সূচনা করলেন, সেখানে বিভিন্ন মত পথের মানুষ উপস্থিত ছিলেন, আমন্ত্রিত অতিথিদের একটি বৃহৎ অংশ ছিল নারী। বিএনপি দল হিসেবে এবং জাইমা রহমানের পরিবার রাজনৈতিক দলের পরিচালক হিসেবে নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা, সুশিক্ষা নিশ্চিত করার যে অবারিত প্রচেষ্টা করেছে, সেই নারীদের অধিকার নিয়েই কথা বলেছেন জাইমা রহমান।
সব মত পথের মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশার আশ্রয়স্থল হিসেবে যে রাজনৈতিক দল-এ দেশে প্রতিষ্ঠিত, জাইমা রহমান সেই দলের প্রতিনিধি হয়ে, প্রথমেই ভিন্ন ভিন্ন আদর্শের মানুষ দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে একসাথে বসে আলোচনা করছেন, সেই প্রসঙ্গ টেনে এনেছেন। তিনি এমনটা বলেছেন যে, তিনি এমন কোনো মানুষ নয় যার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে, কিন্তু যে যার জায়গা থেকে চেষ্টা করলে দেশের জন্য ভালো কিছু করা সম্ভব।
নারী হিসেবে তিনি তার মায়ের চিকিৎসা পেশায় এগিয়ে যাওয়ার কথা খুব গর্বের সাথে বললেন, সেই যাত্রায় পরিবারের পুরুষদের সহযোগিতার কথাও তিনি অকপটে স্বীকার। পারিবারিক সৌহার্দ্য, ত্যাগ এবং স্ব স্ব স্থান থেকে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকলে যে যে-কোনো সমস্যাই সমাধান করা সম্ভব, তা এই উদাহরণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। তিনি বলেছেন, নারীর সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন পরিবার থেকে। আর তিনি এটাও বলেছেন যে, পরিবারই হচ্ছে মানুষের জীবনের প্রথম পাঠশালা।
তিনি ধারাবাহিকভাবে তার পরিবারের উদাহরণ দিয়ে নারীর অধিকার, ক্ষমতায়ন এবং এগিয়ে চলার ধারাগুলো বর্ণনা করেছেন। ১৯৭৯ সালে তাঁর নানুর নিজের বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত বিনামূল্যে পাঠদানের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয় ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে প্রাচীনতম এনজিওগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি প্রতিষ্ঠান, যা অসংখ্য শিশুর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থবহ পরিবর্তন এনেছে। জাইমা রহমান বলেন, তাঁর নানু এই চমৎকার কাজটি সফলভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছেন তার আশেপাশের পুরুষরা তাঁর উপরে আস্থা রেখেছিলেন বলে, তাঁর কাজের উপর বিশ্বাস রেখেছিলেন বলে, তার নেতৃত্বকে সম্মান করেছিলেন বলে, তাঁর কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেননি বলে।
জাইমা রহমান মনে করেন, তার দাদা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বুঝতেন, নারীকে বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই পূর্ণতা পায় না। তিনি নারীকে দেখতেন পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে এবং জনজীবনে সক্ষম অংশগ্রহণকারী হিসেবে। এই বিশ্বাসই তাঁর রাষ্ট্রনায়ক সুলভ সিদ্ধান্তগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বে পোশাকশিল্পের বিস্তার লাখো নারীর জন্য প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক কর্মজীবনের দরজা খুলে দেয়, যা তাদের আয়ের সুযোগ ও আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করে। নারী বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা ছিল এই উপলব্ধিরই বহিঃপ্রকাশ, নারী ও কন্যাশিশুর জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সচেতন পরিকল্পনা ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
জাইমা রহমান বলেন, তার দাদি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া মনে করেছিলেন যে, শিক্ষাই নারী কণ্ঠ, আত্মবিশ্বাস ও পথচলার দৃঢ়তা এনে দেবে। এজন্যই তিনি নারী শিক্ষার প্রসারের জন্য অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর গৃহীত উদ্যোগ বিনামূল্যের মাধ্যমিক শিক্ষা, ‘খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা’ ও ‘নগদ অর্থ সহায়তার বিনিময়ে শিক্ষা’ কর্মসূচি এ দেশের লাখো লাখো মেয়েদের শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত করে।
তিনি দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কর্তৃক গৃহীত নারী মাধ্যমিক বিদ্যালয় সহায়তা প্রকল্প (Female Secondary School Assistance Project), বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করে এবং আন্তর্জাতিকভাবেও একটি অনুসরণীয় মডেলে পরিণত হয়। লন্ডনে থাকা অবস্থায় তিনি তার দাদিকে নিয়ে হাসপাতালে থাকার সময়ের একটি ঘটনার অনুভূতি প্রকাশ করেন। নাইজেরিয়ান একজন নার্স বলেন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশে অবৈতনিক শিক্ষা চালু করে, সেটা দেখে তার দেশের সরকারও সেই উদ্যোগ গ্রহণ করে, যার ফলে তাঁদের দেশে লাখো লাখো নারীরা শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়।
চমকপ্রদ এই বক্তব্যে জাইমা রহমান খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন যে, নারীর ক্ষমতায়ন শুধুই শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি অর্থনৈতিক সুযোগ দেওয়া, সামাজিকভাবে সহায়তা প্রদান ও নীতিগত বাস্তবতার সামগ্রিক ফল। শিক্ষা তখনই টেকসই হয়, যখন নারীরা ঋণপ্রাপ্তি, জীবিকাভিত্তিক উদ্যোগ, ক্ষুদ্র ব্যাবসা, মাতৃত্বকালীন ছুটি ও শিশুদের যত্ন ব্যবস্থার মতো সহায়ক কাঠামো পান। তিনি দেখিয়েছেন, লিঙ্গ সমতা দেশের জাতীয় উন্নয়ন ও অর্থনীতির একটি মৌলিক শর্ত।
অবৈতনিক গৃহস্থালি ও যত্নমূলক শ্রমে নারীদের বিশাল অবদান, শ্রমশক্তিতে কম অংশগ্রহণ এবং বিবাহ ও মাতৃত্বের পর কর্মক্ষেত্র থেকে ঝরে পড়ার বাস্তবতা তুলে ধরে তিনি বোঝান, বিদ্যমান ব্যবস্থাই এখনও নারীর আত্মত্যাগকে স্বাভাবিক ধরে নেয়, যা উন্নয়নের পথে বড়ো বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
একই সঙ্গে তার বক্তব্য ছিল গভীরভাবে ইতিবাচক ও আশাবাদী। তিনি দেখিয়েছেন, পরিবর্তনের সূচনা হয় পরিবার ও আচরণ থেকে, বিশেষ করে পুরুষদের ভূমিকা এখানে অনন্য। বাবা, স্বামী, ভাই ও সহকর্মীদের বিশ্বাস যখন কথার গণ্ডি পেরিয়ে দৈনন্দিন আচরণে প্রতিফলিত হয়, তখনই নারীরা টিকে থাকার পাশাপাশি বিকশিত হয়। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, সম্মান, আস্থা ও সমতার চর্চা কীভাবে আত্মবিশ্বাসী নারী নেতৃত্ব তৈরি করে। তাঁর মূল বার্তাটি স্পষ্ট, নারীদের পাশে টেনে নেওয়া হলে তাঁরা শুধু নিজের জীবন নয়, পরিবার, সমাজ এবং পুরো জাতির ভবিষ্যৎ বদলে দিতে সক্ষম হয়।
একটা দীর্ঘশ্বাসে, এক পলকে, এক নজরে শুনে ফেলেছে সবাই। উপস্থিত সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছে, মানুষ তালি দিয়েছে, সাদরে গ্রহণ করেছে। সবশেষে উপস্থিত নারীদের সাথে কুশল বিনিময় করেছেন তিনি, হাত মিলিয়েছেন, যে পরিবার এ দেশের মানুষের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত, সেই পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সান্নিধ্যে মানুষের আবেগের পারদ উদ্বেলিত হয়েছে। কথায় বলে “Morning shows the day” প্রথম যাত্রায় যে অসম্ভব সুন্দর মধুরতা জাইমা রহমান ছড়ালেন, তা ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচকতার স্রোতোধারা হয়ে বইতে থাকলে নিশ্চিন্ত হবে দল, দেশ তথা দেশের আপামর জনতা।






