নতুন বাংলাদেশ গঠনের রূপরেখা ঘোষণা জামায়াত আমিরের

ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা করেছেন বৈষম্যহীন, মানবিক ও স্বচ্ছ রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা; নারীর ক্ষমতায়ন, যুব কর্মসংস্থান ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি।
টু্ইট প্রতিবেদক: আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান একটি বৈষম্যহীন, স্বচ্ছ এবং মানবিক রাষ্ট্র গঠনের সুদূরপ্রসারী রূপরেখা তুলে ধরেছেন।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘পলিসি সামিট-২০২৬’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের বাংলাদেশে বিভাজন নয়, বরং আশা, নিরাময় ও ঐক্যই রাজনীতির মূল ভিত্তি হবে।
সামিটে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ভারত, পাকিস্তানসহ প্রায় ৩০টি দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধি, বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী এবং জ্যেষ্ঠ গণমাধ্যম ব্যক্তিরা অংশ নেন। বিদেশী কূটনৈতিকদের অংশগ্রহণ জামায়াতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও প্রসারতার গুরুত্ব ফুটিয়ে তোলে।
রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: ঐক্য, ন্যায় ও স্বচ্ছতা
ডা. শফিকুর রহমান জোর দিয়ে বলেন, নতুন বাংলাদেশ হবে এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে ন্যায়, স্বচ্ছতা এবং নৈতিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত উন্নয়নই টেকসই হবে। তিনি গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারের স্বার্থে আসন্ন নির্বাচনের সততা ও নিরপেক্ষতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন এবং উল্লেখ করেন, গত ১৭ বছরে ফ্যাসিবাদী শাসন দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
তিনি দুর্নীতি, লুটপাট ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, কোনো সরকার যেন রাষ্ট্রীয় সম্পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য জামায়াত আপসহীন থাকবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে স্বচ্ছতা না থাকলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন।
সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষাকে তিনি কেবল রাজনৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং ‘পবিত্র ধর্মীয় কর্তব্য’ হিসেবে উল্লেখ করেন। জামায়াত বর্তমানে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের প্রায় পাঁচ লাখ সদস্য নিয়ে কাজ করছে। জাতি, ধর্ম বা লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় দলটি অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করবে বলে তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি: স্বচ্ছ বাজার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ডা. শফিকুর রহমান আধুনিক বাজার অর্থনীতি ও সামাজিক নিরাপত্তার ওপর ভিত্তি করে একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, নতুন বাংলাদেশে উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ অর্থনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে, যাতে বিনিয়োগে আস্থা তৈরি হয়।
শিল্পায়নের ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই)-এর উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান। কৃষি খাতের আধুনিকায়ন, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেন। তরুণ প্রজন্মকে দেশের প্রবৃদ্ধির ‘ইঞ্জিন’ হিসেবে উল্লেখ করে যুব কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন, কারণ কর্মসংস্থানহীন তরুণ সমাজ রাষ্ট্রের জন্য বড় ঝুঁকি।
সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি: নারী ক্ষমতায়ন ও সমান অধিকার
নারীর ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, দক্ষিণ এশিয়ায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নারীর অংশগ্রহণের হারে জামায়াত শীর্ষে রয়েছে। দলের মোট সদস্যের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।
নতুন বাংলাদেশে নারীদের সমান নাগরিক হিসেবে পূর্ণ সম্ভাবনা বিকশিত করার জন্য প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষায় সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে। নারীদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে কোনো বৈষম্য বরদাশত করা হবে না।
গণভোট ও নির্বাচনী প্রস্তুতি: ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে
সামিটে ডা. শফিকুর রহমান জানান, আসন্ন গণভোটে জামায়াত ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে কাজ করবে। তিনি নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ রাখার আহ্বান জানান এবং দুর্নীতিবিরোধী পদক্ষেপ, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা ও সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার কথাও বলেন।
তিনি ঢাকা-১৫ আসনে মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা হয়েছে উল্লেখ করে বলেন, এটি দলের নির্বাচনী প্রস্তুতির অংশ।
আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও ঐক্যের আহ্বান
বক্তব্যের শেষে তিনি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। সামিটে উপস্থিত বুদ্ধিজীবীদের ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, বর্তমান সময় বিভাজনের নয়, সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। স্থানীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
ডা. শফিকুর রহমান ২০২৬-২০২৮ সেশনের জন্য পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন, এবং তার নেতৃত্বে জামায়াত নির্বাচনী জোট গঠন করছে। আসন বণ্টন নিয়ে কিছু টানাপোড়েন থাকলেও, দল বাস্তবায়নযোগ্য পরিকল্পনা তুলে ধরার অঙ্গীকার করেছে এবং মিথ্যা আশ্বাস দেবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই রূপরেখা জামায়াতের মধ্যপন্থী ইমেজকে শক্তিশালী করছে, তবে নির্বাচনী ময়দানে এর প্রভাব দেখার অপেক্ষা। সামিটকে দলের নির্বাচনী প্রস্তুতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে।







