গণভোট প্রচারণা: কিন্তু ভোটারদের বিভ্রান্তি ও তথ্য ঘাটতি

সারা দেশে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা তীব্র, তবু প্রত্যন্ত এলাকায় ভোটাররা গণভোটের অর্থ, প্রকৃতি ও প্রভাব জানে না; বিভ্রান্তি ও তথ্যের ঘাটতি ভোটার সচেতনতা বাধাগ্রস্ত করছে।
আব্দুল্লাহিল শাহীন: আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একযোগে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এই গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘জুলাই ন্যাশনাল চার্টার’-এর ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে।
অন্তর্বর্তী সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে ব্যাপক ও সমন্বিত প্রচারণা চালালেও সারা দেশে ভোটারদের মধ্যে গণভোটের অর্থ, প্রকৃতি ও সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও তথ্য ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকে দায়সারা ভাবে ব্যানার টাঙিয়ে গণভোটের প্রচারে অংশ নিচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) জানিয়েছে, গণভোটকে কেন্দ্র করে তারা লক্ষাধিক লিফলেট, ব্যানার, পোস্টার এবং ডিজিটাল কনটেন্ট প্রচার করছে। তবে বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এসব প্রচারণার প্রভাব খুবই সীমিত। সরকারি কর্মকর্তা, উপদেষ্টা এবং রাজনৈতিক দলগুলো প্রচারণায় সক্রিয় থাকলেও সমালোচকদের একটি বড় অংশ এটিকে ‘রাষ্ট্রীয় ম্যানিপুলেশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন।
সরকারি প্রচারণা: ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে উদ্যোগ
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছেন। ওই বার্তায় তিনি বলেন, “হ্যাঁ ভোট দিয়ে বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়নমুক্ত বাংলাদেশ গড়ুন।” তাঁর এই আহ্বানকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন স্তরে প্রচারণা আরও জোরদার হয়েছে।
সরকারের বিভিন্ন উপদেষ্টা জেলায় জেলায় গিয়ে সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগ চালাচ্ছেন। এর মধ্যে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম পাবনায়, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ময়মনসিংহে, স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান কিশোরগঞ্জে এবং চট্টগ্রাম পার্বত্য উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা রাঙামাটিতে প্রচারণা সভা করেছেন।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রিয়াজ জানিয়েছেন, সরকারি কর্মচারীদের ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে কোনো আইনি বাধা নেই এবং এটিকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। এ ছাড়া ব্যাংকগুলো তাদের সিএসআর ফান্ড থেকে প্রচারণা চালাচ্ছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্যাম্পেইন শুরু হয়েছে এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে ইমামদের গণভোট বিষয়ে সচেতনতা তৈরির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের ১৭ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে গণভোটের প্রচারে যুক্ত করা হয়েছে।
ভোটের গাড়ি ও নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ
সারা দেশে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগে ‘ভোটের গাড়ি’ প্রচারণা কার্যক্রম চলছে। গাজীপুর সিটি করপোরেশন, ময়মনসিংহ, রাজশাহী ও বাগেরহাটসহ বিভিন্ন এলাকায় গান, ভিডিও ডিসপ্লে, উঠান বৈঠক ও পথসভার মাধ্যমে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, তারা ৮০ লাখ লিফলেট মুদ্রণ করেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে।
এবারের গণভোটে প্রথমবারের মতো বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের জন্য পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যা নির্বাচন কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
ভোটারদের বিভ্রান্তি: প্রত্যন্ত এলাকায় তথ্য ঘাটতি
তবে মাঠপর্যায়ের চিত্র ভিন্ন। রংপুরের তারাগঞ্জসহ বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অনেক মানুষ গণভোটের অর্থই জানেন না। কেউ কেউ মনে করছেন, ‘হ্যাঁ’ মানে ভোট দেওয়া আর ‘না’ মানে ভোট না দেওয়া। সিলেট, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনা অঞ্চলেও একই ধরনের বিভ্রান্তি দেখা যাচ্ছে।
হাটবাজারে কোথাও কোথাও প্রজেক্টর প্রদর্শনী ও ব্যানার থাকলেও তা গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। মুন্সিগঞ্জের অনেক ভোটার গণভোটকে ‘বড় ভোট’ হিসেবে দেখছেন, কিন্তু সাংবিধানিক সংস্কারের বিস্তারিত কী—তা জানেন না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ায় ভোটারদের বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে।
নির্বাচন কমিশন নিজেও স্বীকার করেছে যে, বর্তমান প্রচারণা পর্যাপ্ত নয় এবং ভোটার শিক্ষার পরিধি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
সমালোচনা ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
গণভোটকে ঘিরে সরকারের ভূমিকা নিয়ে সমালোচনাও জোরালো হচ্ছে। সমালোচকদের মতে, সরকারের ‘হ্যাঁ’ প্রচারণা নিরপেক্ষতার নীতি লঙ্ঘন করছে। ব্যাংক, সরকারি কর্মচারী এবং মসজিদের ইমামদের যুক্ত করাকে তারা ‘রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ’ হিসেবে দেখছেন।
আওয়ামী লীগের নেতারা এই গণভোটকে ‘অসাংবিধানিক’ আখ্যা দিয়ে বয়কটের ঘোষণা দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ইআরআই নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে এবং ভোটার সচেতনতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছে। বিশ্লেষক ও কলামিস্ট মাসুদা ভাট্টি এটিকে ‘ইউনুসের অশুভ লক্ষণ’ বলে মন্তব্য করেছেন এবং দাবি করেছেন, এটি সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে অপরাধীদের ক্ষমা দেওয়ার একটি যন্ত্র হতে পারে। তবে সরকার ও সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ বলছে, এই প্রচারণা নিরপেক্ষতা লঙ্ঘন করে না; বরং জনসচেতনতা বাড়ায়।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছরে সীমিত হবে, উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে এবং নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে গঠিত হবে। তবে ভোটারদের অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তি ভোটার উপস্থিতি (টার্নআউট) কমাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্র সতর্কতা জারি করেছে যে, এই সময়ে রাজনৈতিক সমাবেশ সহিংস হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে গণভোটকে ঘিরে প্রচারণা তীব্র হলেও প্রত্যন্ত এলাকায় তথ্য পৌঁছানোর ঘাটতি স্পষ্ট, যা গণভোটের গ্রহণযোগ্যতা ও সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটাররা যেন সচেতন ও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সে জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে আরও কার্যকর ও নিরপেক্ষ উদ্যোগ নিতে হবে।







