ডাল আমদানিতে ভারতের পাল্টা শুল্কে ক্ষোভ যুক্তরাষ্ট্রের

প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তিতে নতুন বাধা, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ চান মার্কিন সিনেটররা
টুইট প্রতিবেদক: ডাল জাতীয় শস্য আমদানির ওপর ভারতের আরোপিত ৩০ শতাংশ শুল্ককে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির বাণিজ্য সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এই শুল্কের ফলে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে প্রস্তাবিত বাণিজ্য চুক্তি আবারও বড় ধরনের বাধার মুখে পড়তে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রভাবশালী রিপাবলিকান সিনেটর—স্টিভ ডেইনস ও কেভিন ক্রেমার—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে ভারতের এই শুল্ককে “অন্যায্য” আখ্যা দিয়েছেন। তারা অভিযোগ করেন, এই শুল্কের কারণে মার্কিন ডাল উৎপাদনকারীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) প্রকাশিত ওই চিঠিতে সিনেটররা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ কামনা করে বলেন, ভারতের এই উচ্চ শুল্ক অবিলম্বে প্রত্যাহার না হলে মার্কিন কৃষিপণ্যের জন্য ভারতীয় বাজার কার্যত বন্ধ হয়ে যাবে। তারা মনে করেন, এই শুল্ক মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত বছর ভারতের ওপর আরোপিত ৫০ শতাংশ শাস্তিমূলক শুল্কের পাল্টা জবাব হিসেবেই নেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মন্টানা ও উত্তর ডাকোটা রাজ্য ডাল ও মটরশুঁটি উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। অন্যদিকে, ভারত বিশ্বের বৃহত্তম ডাল ভোক্তা দেশ, যা বৈশ্বিক ডাল চাহিদার প্রায় ২৭ শতাংশ ব্যবহার করে। এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারে শুল্ক বাড়ানোর ফলে মার্কিন কৃষকরা অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বলে তারা সতর্ক করেন।
সিনেটররা জানান, ভারত সরকার গত বছরের ৩০ অক্টোবর হলুদ মটরশুঁটির ওপর ৩০ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেয়, যা ১ নভেম্বর ২০২৫ থেকে কার্যকর হয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ডাল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যা সমাধান করা গেলে তা একদিকে যেমন মার্কিন উৎপাদকদের উপকারে আসবে, তেমনি ভারতীয় ভোক্তারাও ন্যায্য দামে ডাল পণ্য পাবে।
সিনেটররা ট্রাম্পের আগের মেয়াদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে উল্লেখ করেন, ২০২০ সালের বাণিজ্য আলোচনার সময়ও তারা একই বিষয় উত্থাপন করেছিলেন। তখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে সেই চিঠি প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন, যার ফলে মার্কিন ডাল উৎপাদকরা আলোচনার টেবিলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পেয়েছিল।
চিঠিতে তারা আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি বৈশ্বিক বাণিজ্যের অসমতা দূর করতে চায়, তবে মার্কিন কৃষকরা বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি পূরণে সক্ষম। তবে এর জন্য ভারতের মতো বড় বাজারগুলোতে অনুকূল ও ন্যায্য বাণিজ্য পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
এর আগে ২০১৯ সালে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা থেকে বাদ দেওয়ার পর থেকেই দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে টানাপড়েন শুরু হয়। বর্তমানে মসুর ডাল, ছোলা ও মটরশুঁটির মতো ডাল জাতীয় পণ্যে ভারতের কঠোর অবস্থান নতুন বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
মার্কিন সিনেটররা ট্রাম্পকে অনুরোধ জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে যেকোনো নতুন বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরের আগে ডাল জাতীয় শস্যের জন্য বিশেষ ও অনুকূল শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উত্তেজনা দক্ষিণ এশীয় বাজারে মার্কিন কৃষিপণ্যের ভবিষ্যৎ এবং ভারতের বাজার স্থিতিশীলতার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশ কোন পথে?
ভারত–যুক্তরাষ্ট্রের ডাল শুল্ক বিরোধ বৈশ্বিক বাণিজ্যের অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো আমদানি–নির্ভর দেশেও পড়তে পারে। বড় শক্তিগুলোর শুল্ক যুদ্ধ নিত্যপণ্যের দাম ও বাজার স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জন্য জরুরি হলো কৌশলগত ভারসাম্য—একদিকে প্রতিবেশী ও বৈশ্বিক অংশীদারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে বহুমুখী আমদানি উৎস ও নিজস্ব কৃষি উৎপাদন জোরদার করা। নইলে অন্যদের বাণিজ্য দ্বন্দ্বের প্রভাবই বহন করতে হবে বাংলাদেশকে।
সূত্র: এনডিটিভি






