সংসার টিকছে না বরিশালে! দিনে ৯টি ডিভোর্স, নারীরা এগিয়ে

বিবাহবিচ্ছেদ আশঙ্কাজনক: দুই বছরে ১৮ হাজার বিয়ের বিপরীতে ৬ হাজারের বেশি বিচ্ছেদ, তালাকে নারীরাই এগিয়ে!
টুইট প্রতিবেদক: বরিশাল জেলায় বিবাহবিচ্ছেদের হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রবণতা শুধু পারিবারিক বন্ধনকে দুর্বল করছে না, বরং সমাজের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপরও বিরূপ প্রভাব ফেলছে।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল শহরে প্রতিদিন গড়ে নয়টি(৯) করে ডিভোর্স বা তালাকের আবেদন জমা পড়ছে। গত দুই বছরে নিবন্ধিত বিয়ের তুলনায় বিচ্ছেদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি, যেখানে পুরুষদের তুলনায় নারীরাই বিচ্ছেদের আবেদনে এগিয়ে রয়েছেন। এটি নারীদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনি অধিকার ব্যবহারের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়ের সূত্র জানায়, গত দুই বছরে বরিশালে মোট ১৮ হাজার ৬৪৪টি বিয়ে নিবন্ধিত হয়েছে। এর বিপরীতে বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে ৬ হাজার ৩৫২টি।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ৯ হাজার ৬৬৬টি বিয়ের মধ্যে ৩ হাজার ৫টি সংসার ভেঙে গেছে। আর ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৯৭৮টি বিয়ের বিপরীতে বিচ্ছেদ হয়েছে ৩ হাজার ৩৪৭টি।
বরিশাল জেলা রেজিস্ট্রার মোহসীন মিয়া বলেন, “২০২৩ ও ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তালাক বা বিচ্ছেদের আবেদনে নারীর সংখ্যা বেশি। ২০২৫ সালে এই প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।” তার মতে, এই চিত্র জাতীয় প্রবণতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বিবাহবিচ্ছেদের প্রধান কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা পারিবারিক কলহ, মনোমালিন্য ও পারস্পরিক অবিশ্বাসকে দায়ী করছেন।
অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করেও সম্পর্ক ভেঙে যাচ্ছে। পাশাপাশি পারিবারিক হতাশা থেকে আত্মহত্যা চেষ্টার ঘটনাও ঘটছে। এরই একটি উদাহরণ হিসেবে বরিশাল মহানগরীর নথুল্লাবাদ এলাকার এক ব্যবসায়ী পারিবারিক সম্পর্কে আস্থা হারিয়ে সম্প্রতি কীটনাশক পান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে তিনি চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠেন।
এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের মাধ্যমে বিয়ে করে সংসার টিকিয়ে রাখতে না পারার ঘটনাও বেড়েছে। যৌতুক দাবি, শারীরিক নির্যাতন, পরকীয়া, স্বামীর বেকারত্ব, মাদকাসক্তি এবং অনলাইন জুয়ার আসক্তির কারণে বহু নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। ভুক্তভোগী নারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কারণে তারা বাধ্য হয়ে তালাক নিয়ে বাবার বাড়িতে ফিরে যাচ্ছেন।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, বরিশালের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল মান্নান মৃধা বলেন, “বিচ্ছেদসংক্রান্ত মামলা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। অধিকাংশ মামলাতেই বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের অভিযোগ উঠে আসছে।”
বেসরকারি সংস্থা ব্লাস্ট বরিশালের কো-অর্ডিনেটর অ্যাডভোকেট শাহিদা বেগম বলেন, “ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসন না মানার প্রবণতা বাড়ায় বিচ্ছেদের সংখ্যা বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।”
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিক্স (বিবিএস) অনুযায়ী, ২০২৩ সালে সারাদেশে বিবাহবিচ্ছেদের হার ছিল ১.১ শতাংশ, যা ২০২২ সালে ছিল ১.৪ শতাংশ। বরিশাল বিভাগে এই হার তুলনামূলকভাবে কম—০.২৯ শতাংশ হলেও স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছেদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। জাতীয়ভাবে গ্রামাঞ্চলে বিবাহবিচ্ছেদের হার বেশি (১.১ শতাংশ), এবং সেখানেও নারীরাই বেশি আবেদন করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম-প্রভাবিত সম্পর্ক, নারীদের শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি এই প্রবণতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তারা মনে করছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় পারিবারিক কাউন্সেলিং, সামাজিক সচেতনতা কর্মসূচি এবং আইনি সহায়তা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।






