শিক্ষক–জনবল সংকটে থমকে আছে পাহাড়ের একমাত্র নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

স্বপ্ন আছে, কিন্তু দিশা নেই

অসীম রায় (অশ্বিনী), বান্দরবান: ভোরের কুয়াশা ভেদ করে প্রতিদিন শত শত তরুণ–তরুণী ছুটে আসে বান্দরবান নার্সিং কলেজের চত্বরে। গায়ে সাদা এপ্রোন, চোখে স্বপ্ন—নার্স হয়ে পাহাড়ি জনপদের অসহায় মানুষের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত করার। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ আজ কণ্টকাকীর্ণ।

শিক্ষক ও জনবলের তীব্র সংকটে থমকে আছে পাহাড়ি জেলা বান্দরবানের একমাত্র নার্সিং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি। এই সংকট শুধু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চিত করছে না, বরং পাহাড়ি অঞ্চলের পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়নকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

২০১৮ সালে পাহাড়ি অঞ্চলে আধুনিক নার্সিং শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্য নিয়ে বান্দরবান সদর হাসপাতাল চত্বরে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় বান্দরবান নার্সিং কলেজ।

২০২০ সাল থেকে এখানে ব্যাচেলর অব সায়েন্স ইন নার্সিং (বিএসসি নার্সিং), ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি এবং ডিপ্লোমা ইন মিডওয়াইফারি—এই তিনটি কোর্সে পাঠদান শুরু হয়। বান্দরবানসহ পার্শ্ববর্তী পাহাড়ি ও সমতল এলাকার শিক্ষার্থীদের দক্ষ নার্স হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমে পাহাড়ের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছিল এই প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু যাত্রার প্রায় সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই আশা আজ অনেকটাই ম্লান। কলেজ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মঞ্জুরিকৃত ৪২টি শিক্ষক পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩ জন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ২৩টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র তিনজন কর্মচারী। এই সীমিত জনবল দিয়েই চালাতে হচ্ছে ৪৩৩ জন শিক্ষার্থীর পাঠদান, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম।

এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের ব্যবহারিক দক্ষতার ওপর। পাহাড়ি অঞ্চলে যেখানে চিকিৎসা ও নার্সিং সেবার ঘাটতি দীর্ঘদিনের, সেখানে দক্ষ নার্স তৈরির এই প্রতিষ্ঠান নিজেই টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত।

শিক্ষার্থীদের কণ্ঠে সেই বাস্তবতার প্রতিধ্বনি স্পষ্ট। কলেজের শিক্ষার্থী পাইমে মার্মা বলেন, “আমাদের এখানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। দ্রুত এই সংকট সমাধান না হলে ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা এই কলেজে ভর্তি হতে নিরুৎসাহিত হবে।”

আরেক শিক্ষার্থী মো. মুহিন হোসেন বলেন, “বান্দরবান ও আশপাশের এলাকায় নার্সিংয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য এটিই একমাত্র প্রতিষ্ঠান। অথচ শুরু থেকেই এখানে শিক্ষক সংকট রয়ে গেছে।”

দূরবর্তী পাহাড়ি গ্রাম থেকে আসা এসব শিক্ষার্থীর জন্য বিকল্প কোনো সুযোগ নেই। অনেকেই পরিবার ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা উপেক্ষা করে এখানে পড়তে এসেছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ না পেলে তাদের স্বপ্নও ধীরে ধীরে ভেঙে পড়ছে।

শিক্ষকদের অবস্থাও কম কঠিন নয়। কলেজের নার্সিং ইনস্ট্রাক্টর নমিতা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “আমরা সবাই আন্তরিকভাবে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু শিক্ষকসংকটের কারণে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিতে হচ্ছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।”

এই অতিরিক্ত চাপ শিক্ষকদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলছে, যার প্রতিফলন শেষ পর্যন্ত পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে।

শুধু শিক্ষক সংকটই নয়, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও নিত্যদিনের সঙ্গী। ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাবে পর্যাপ্ত সরঞ্জামের অভাব, মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর ও জেনারেটরের সংকট, এমনকি প্রয়োজনীয় চেয়ার–টেবিলের ঘাটতিতেও ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান।

শিক্ষার্থী অনুমেন মার্মা বলেন, “ইংলিশ ল্যাঙ্গুয়েজ ল্যাব আমাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেখানে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নেই। নানা সংকটের মধ্যেই আমাদের পড়াশোনা চালাতে হচ্ছে।”

স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, পাহাড়ি তরুণ–তরুণীদের জন্য বান্দরবান নার্সিং কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়—এটি একটি সম্ভাবনার নাম। দ্রুত শিক্ষক ও জনবল নিয়োগ এবং অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধান না হলে এই প্রতিষ্ঠান তার উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হবে।

কলেজের অধ্যক্ষ রাশেদা বেগম বলেন, “নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে। বর্তমানে কলেজে ৪৩৩ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। উন্নত শিক্ষার স্বার্থে দ্রুত পর্যাপ্ত শিক্ষক ও জনবল নিয়োগ প্রয়োজন। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”

তবে মাঠের বাস্তবতায় এখনো দৃশ্যমান কোনো সমাধান নেই। ফলে পাহাড়ি যুবক–যুবতীদের স্বাস্থ্যসেবায় যুক্ত হওয়ার স্বপ্ন ক্রমেই অনিশ্চয়তার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

পাহাড়ি অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে বান্দরবান নার্সিং কলেজের ভূমিকা অপরিসীম। এই প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু শিক্ষার্থীরা নয়—ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো পাহাড়ি জনপদ। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এটি একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়; এটি পাহাড়ি তথা দেশের মানুষের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্ন।