ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড চাপ: ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর ১০% ট্যারিফ, জুনে ২৫% করার হুমকি

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের ট্যারিফ চাপ, ইউরোপ–ন্যাটো মুখোমুখি, আর্কটিক রাজনীতিতে উত্তেজনা।
টুইট প্রতিবেদক: গ্রিনল্যান্ড কেনার দাবিকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় মিত্রদের ওপর সরাসরি অর্থনৈতিক চাপ বাড়ালেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) আটটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে ট্যারিফ আরোপের ঘোষণা দিয়ে তিনি জানান, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে এসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া সব পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে।
গ্রিনল্যান্ডের “সম্পূর্ণ ও পূর্ণ ক্রয়” নিয়ে কোনো চুক্তি না হলে ১ জুন থেকে এই ট্যারিফ বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ড বছরের পর বছর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা সুবিধা ভোগ করলেও গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে “ন্যায্য সহযোগিতা” করছে না।
তাঁর দাবি, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য “অপরিহার্য”, বিশেষ করে আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের প্রভাব মোকাবিলা, বিরল খনিজ সম্পদ এবং নতুন মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘গোল্ডেন ডোম’ স্থাপনের ক্ষেত্রে।
গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং আর্কটিক অঞ্চলের অন্যতম কৌশলগত ভূখণ্ড। ২০১৯ সাল থেকেই ট্রাম্প প্রকাশ্যে গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ দেখিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক পোস্টে তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপের কয়েকটি দেশ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক প্রশিক্ষণ ও নজরদারি বাড়িয়েছে, যা তিনি “বিপজ্জনক ও অস্বচ্ছ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, “গ্রিনল্যান্ড শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নিরাপদ রাখতে পারে।”
ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর ইউরোপজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ বলেন, “হুমকি দিয়ে বা অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে কোনো সার্বভৌম ভূখণ্ড কেনা যায় না—এটি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।” যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক সম্পর্ককে বিপজ্জনকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এতে ন্যাটোর ঐক্য দুর্বল হবে এবং এর সুযোগ নিতে পারে রাশিয়া ও চীন।
ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড—উভয় পক্ষই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, “গ্রিনল্যান্ড বিক্রির জন্য নয়।” গ্রিনল্যান্ডের রাজধানী নুকসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন। বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল— “Greenland is not for sale” এবং “Hands off Greenland”। ইইউ কমিশনও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ট্যারিফ কার্যকর করে, তবে তারা উপযুক্ত ও কঠোর পাল্টা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভক্ত মত দেখা গেছে। কিছু রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের অবস্থানকে সমর্থন করে একে “অর্থনৈতিক লিভারেজ” হিসেবে দেখছেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এতে ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং নতুন করে যুক্তরাষ্ট্র–ইইউ বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই কৌশল বাস্তবায়িত হলে ইউরোপীয় অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হবে এবং আর্কটিক অঞ্চলকে ঘিরে ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র হতে পারে। তবে ট্রাম্প শিবিরের দাবি, গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য এটি একটি “সাহসী ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত”।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গ্রিনল্যান্ড ক্রয় নিয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। ইউরোপীয় দেশগুলো কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করছে এবং ট্যারিফ কার্যকর হলে পাল্টা পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছে।







