মিশিগানে বেগম জিয়া স্ট্রিট নামে সড়ক অনুমোদন বাতিল

টুইট ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি দেশে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী নেতা-কর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের আবেগপ্রবণতা এবং রাজনৈতিক মতভেদের জেরে শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়ে গেছে বাংলাদেশের সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার নামে মিশিগানের একটি সড়কের নামকরণ-‘বেগম খালেদা জিয়া স্ট্রিট’। শুধু তাই নয়, আন্দোলনের মুখে ভারতে চলে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামেও পরবর্তীতে প্রস্তাবিত আরেকটি সড়কের নামকরণও অনুমোদন পায়নি।
গত ১৩ জানুয়ারি জনপ্রতিনিধি ও নাগরিকদের সমন্বয়ে আয়োজিত এক সভায় সংশ্লিষ্ট সিটির নবনির্বাচিত ইয়েমেনি বংশোদ্ভূত মেয়র এডাম আল-হারবী প্রথমে অনুমোদিত বেগম খালেদা জিয়ার নামে এবং পরবর্তীতে শেখ হাসিনার নামে গৃহীত সড়ক নামকরণের প্রস্তাব দুটি বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে সভায় সিদ্ধান্ত হয়-ভবিষ্যতে শুধু বাংলাদেশ নয়, কোনো দেশের রাজনৈতিক নেতা বা সরকারপ্রধানের নামেই মিশিগানে আর কোনো সড়কের নামকরণ করা হবে না।
এই সিদ্ধান্তের খবর সংশ্লিষ্ট সিটি ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও বিষয়টিতে কিছুটা ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন ওই সিটির একাধিকবার নির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কাউন্সিলম্যান ও সাবেক প্রোটেম মেয়র, আওয়ামী ঘরানার রাজনীতিক আবু মুসা। তিনি দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং তিনি আমাদের কাছে শ্রদ্ধার আসনে অধিষ্ঠিত। তার ইন্তেকালে মহান আল্লাহ যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন।
আবু মুসা জানান, মিশিগানের বিএনপি নেতা-কর্মীদের প্রত্যাশা পূরণে সংশ্লিষ্ট সিটি কাউন্সিলের একজন বাংলাদেশি জনপ্রতিনিধি বেগম খালেদা জিয়ার নামে একটি সড়কের নামকরণের প্রস্তাব আনেন। বোর্ড সভায় আলোচনার পর তা নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত হয়। সে সময় রাজনৈতিকভাবে বেগম জিয়াকে নিয়ে কোনো কটূক্তি বা আপত্তিকর বক্তব্য ওঠেনি।
তবে পরে শেখ হাসিনার নামে আরেকটি সড়কের প্রস্তাব আসার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ঘিরে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। আবু মুসার দাবি, এক জনপ্রতিনিধিসহ বিএনপির এক শ্রেণির প্রবাসী নেতা-কর্মী শেখ হাসিনাকে নিয়ে ‘পলাতক’, ‘ফ্যাসিস্ট’, ‘গুম-হত্যাকারী’—এ ধরনের অভিযোগ তুলে মিশিগানজুড়ে নেতিবাচক আলোচনা শুরু করেন। ১৩ জানুয়ারির কাউন্সিল সভায় এসব বিষয় উঠে আসায় ব্যাপক বিতর্ক হয়।
তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার নামে সড়ক অনুমোদনের সময় এমন বক্তব্য আসেনি। কিন্তু শেখ হাসিনার নাম যুক্ত হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর উভয় পক্ষ থেকেই নিয়মতান্ত্রিকভাবে পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করা হয়। একপর্যায়ে ভোটাভুটিতে ৩–২ ভোটে শেখ হাসিনার নামে একটি সড়ক অনুমোদন পায়।
এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সব দিক বিবেচনা করে সভার সভাপতি ও নবনির্বাচিত মেয়র এডাম আল-হারবী বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নামে অনুমোদিত দুটি সড়কের নামকরণই বাতিল ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন—মিশিগানের উন্নয়ন বা কোনো কার্যক্রমে সংশ্লিষ্ট না থাকা বিদেশি রাজনৈতিক নেতাদের নামে সড়ক নামকরণ কেন প্রয়োজন।
আবু মুসা আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ অ্যাভিনিউ’ নামের একটি সড়কের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে-এমন যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। এটি সিটি কর্তৃপক্ষের এক দপ্তরের অসাবধানতাজনিত ভুল থেকে তৈরি বিভ্রান্তি ছিল, যা সঙ্গে সঙ্গেই সংশোধন করা হয়েছে। ফলে এ নিয়ে আর বিভ্রান্তির সুযোগ নেই।
প্রোটেম মেয়র আবু মুসার মতে, মেয়রের এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী ও ইতিবাচক। তবে তিনি মনে করেন, দুটি প্রস্তাব পুরোপুরি বাতিল নয়, বরং সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে মেয়র সম্মত হলে বাংলাদেশের দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নামে সড়ক নামকরণের প্রস্তাব আবারও উত্থাপিত হতে পারে।
এদিকে বেগম খালেদা জিয়ার নামে সড়ক অনুমোদনের সময় বিএনপির নেতা ও সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধিরা ইতিবাচক বক্তব্য দিলেও, দুটি প্রস্তাব বাতিল হওয়ার পর আপাতত তারা কেউ প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, এই জটিল পরিস্থিতি নিয়ে মিশিগানের বাংলাদেশি তথা বাঙালি কমিউনিটির একটি অংশ মনে করছে, হেমট্রামিক সিটি কাউন্সিল ও মেয়র আল-হারবীর ভূমিকা বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী। তাদের মতে, প্রবাসে বসে দলীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতাদের নামে এমন প্রস্তাব আনা থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে প্রবাসী বাংলাদেশিরা তা আরও ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করবে।
তারা সতর্ক করে বলেন, এ ধরনের উদ্যোগ চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আরও রাজনৈতিক দল তাদের নেতাদের নামে একই ধরনের প্রস্তাব আনতে পারে, যা প্রবাসী কমিউনিটিতে বিভাজন সৃষ্টি করবে এবং পারস্পরিক সুসম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর হবে। তাই জনপ্রতিনিধিদের উচিত ভোটারদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। অন্যথায়, দলীয় রাজনীতি প্রবাসে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের জন্য হাস্যকর আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।






