বাংলাদেশ ঘিরে অপপ্রচার: বব ব্ল্যাকম্যানের বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ

অপপ্রচার বন্ধ হোক: বাংলাদেশকে ঘিরে বিদেশি রাজনৈতিক বক্তব্যর তীব্র প্রতিবাদ।
টুইট ডেস্ক: বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন (১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সামনে রেখে একটি পরিকল্পিত অপপ্রচার নতুন করে দৃশ্যমান হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের কনজারভেটিভ পার্টির এমপি বব ব্ল্যাকম্যান ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, হত্যা ও মন্দির পোড়ানোর ঘটনাকে “ভয়াবহ” আখ্যা দিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু দায়িত্বজ্ঞানহীনই নয়—বরং এটি তথ্যবিকৃতি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য এবং একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ।
হিন্দু পরিচয় থাকলেই কোনো সহিংস ঘটনাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে “ধর্মীয় হামলা” হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এই শ্রেণিবিন্যাসের মানদণ্ড কী? ভুক্তভোগীর ধর্মই যদি একমাত্র নির্ধারক হয়, তবে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, জমি বিরোধ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব বা সাধারণ অপরাধের বাস্তব কারণগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করা হচ্ছে কেন?
প্রথমেই স্পষ্ট করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর রাষ্ট্রীয় মদদে বা পরিকল্পিতভাবে নিধন চলছে—এমন কোনো নিরপেক্ষ, যাচাইকৃত আন্তর্জাতিক প্রমাণ নেই। বিচ্ছিন্ন অপরাধমূলক ঘটনা বা রাজনৈতিক সহিংসতাকে সামগ্রিকভাবে “ধর্মীয় নিপীড়ন” হিসেবে তুলে ধরা একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অসততা। যেকোনো সমাজেই অপরাধ ঘটে, সহিংসতা ঘটে, কিন্তু তা থেকে একটি গোটা রাষ্ট্রকে “সংখ্যালঘু নির্যাতনকারী” হিসেবে চিহ্নিত করা গ্রহণযোগ্য নয়।
বব ব্ল্যাকম্যানের বক্তব্যের আরেকটি বিপজ্জনক দিক হলো, তিনি কার্যত বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে অভিযুক্ত করেছেন সংখ্যালঘু সুরক্ষায় ব্যর্থ হিসেবে, অথচ তিনি একবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পদক্ষেপ, গ্রেপ্তার, মামলা কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেননি।
এটি স্পষ্টতই একপেশে বয়ান। প্রশ্ন উঠছে—একজন বিদেশি এমপি কোন সূত্রে, কোন যাচাইকৃত তদন্তের ভিত্তিতে এত গুরুতর অভিযোগ করছেন?
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ঘোষণা দিয়েছে, ধর্ম, বর্ণ, মত নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সহিংসতার যেসব ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর অধিকাংশই রাজনৈতিক প্রতিশোধ, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত, ধর্মীয় নিপীড়নের সঙ্গে নয়। অথচ এই পার্থক্য ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হচ্ছে।
রাইটস অ্যান্ড রিস্কস অ্যানালাইসিস গ্রুপ (RRAG)-এর মতো কিছু সংস্থার রিপোর্ট উদ্ধৃত করে যেভাবে সংখ্যার রাজনীতি করা হচ্ছে, সেগুলোর পদ্ধতি, উৎস ও যাচাইযোগ্যতা নিয়েও আন্তর্জাতিক মহলে প্রশ্ন রয়েছে। কোনো ঘটনায় ভুক্তভোগী হিন্দু হলেই সেটিকে “ধর্মীয় হত্যা” হিসেবে চিহ্নিত করা একটি মারাত্মক বিশ্লেষণগত ত্রুটি। এই প্রবণতা আসলে সহিংসতার প্রকৃত কারণ আড়াল করে এবং রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের পথ প্রশস্ত করে।
আরও উদ্বেগজনক হলো—এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ২০২৫ সালের মে মাসে অ্যান্টি-টেররিজম অ্যাক্টের অধীনে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং দলটি ২০২৬ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। ফলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাবনা বেড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে বাংলাদেশের নির্বাচনকে আগেভাগেই প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা এখানে লক্ষ্য করা যায়।
প্রশ্ন হচ্ছে—যে যুক্তরাজ্য নিজ দেশে অভিবাসী, সংখ্যালঘু ও মুসলিম বিদ্বেষ সামাল দিতে হিমশিম খায়, তারা কোন নৈতিক অবস্থান থেকে বাংলাদেশকে মানবাধিকার শিক্ষা দিতে আসে? ব্রিটেনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মসজিদে হামলা, ইসলামোফোবিয়া, বর্ণবাদী সহিংসতা নিয়ে কি তারা একই রকম “ভয়াবহ” শব্দ ব্যবহার করেছে?
বাংলাদেশ কোনো উপনিবেশ নয়, যে বিদেশি পার্লামেন্টে বসে তার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিচারিক প্রক্রিয়ার রায় দেওয়া হবে। নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে কি না—তা নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের জনগণ, নির্বাচন কমিশন ও সাংবিধানিক কাঠামো, কোনো বিদেশি এমপি নন।
“আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই—সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিয়ে মিথ্যা বয়ান ছড়িয়ে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার যেকোনো প্রচেষ্টা কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করা হবে” মন্তব্য করেছেন একজন সিনিয়র বাংলাদেশী।
তিনি আরোও বলেন, মানবাধিকার কোনো রাজনৈতিক হাতিয়ার নয়। আর অপপ্রচার কখনো গণতন্ত্র রক্ষা করে না—বরং গণতন্ত্রকে দুর্বল করে।
বাংলাদেশ শান্তি, ন্যায় ও সার্বভৌমত্বের পথে এগোতে চায়। সেই পথে বাধা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা বন্ধ হোক—এটাই এখন সময়ের দাবি।







