আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা ও বিনিয়োগের ঝুঁকি বাড়ছে

ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অতিরিক্ত সরবরাহের টানাপোড়েনে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার অস্থির।
টুইট প্রতিবেদক: আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে চলতি জানুয়ারিতে চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে ভেনেজুয়েলা, ইরান ও ব্ল্যাক সাগর অঞ্চলে একযোগে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা তেলের দামে ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে বিশ্বব্যাপী অতিরিক্ত সরবরাহের বিশাল মজুত সেই উত্থানকে বারবার ঠেকিয়ে দিচ্ছে।
রয়টার্সের জ্যেষ্ঠ এনার্জি কলামনিস্ট রন বুসো এই পরিস্থিতিকে বিনিয়োগকারীদের জন্য “বিপজ্জনক ও বিভ্রান্তিকর বাজার পরিবেশ” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে তিনটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ঘটনা বাজারে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে নিকোলাস মাদুরোর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ঘটনায় প্রথমে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারের নিচে নেমে আসে, কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত তেল মজুতধারী দেশে দ্রুত উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ার আশা তৈরি হয়। তবে পরিস্থিতি পুরোপুরি স্থিতিশীল না হওয়ায় দাম আবার ওঠানামা করছে।
একই সময়ে ইরানে ব্যাপক বিক্ষোভ ও দমন-পীড়নের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের হুমকি হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়, ফলে বাজারে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত ৩–৪ ডলারের ‘জিওপলিটিক্যাল রিস্ক প্রিমিয়াম’ যোগ হয়েছে।
এছাড়া ব্ল্যাক সাগরে ড্রোন হামলায় দুটি তেল ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এই তিন অঞ্চল থেকেই ২০২৫ সালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪.৬ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে, যা বৈশ্বিক মোট সরবরাহের প্রায় ৪.৫ শতাংশ। ফলে এসব এলাকায় সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলছে।
বছরের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬১ ডলার, যা পরে ৬০ ডলারের নিচে নেমে যায়। তবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৯ শতাংশ বেড়ে তা ৬৬ ডলারের ওপরে উঠে তিন মাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়।
আবার আজ বৃহস্পতিবার ১৫ জানুয়ারি ইরান ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের তুলনামূলক নরম অবস্থানের ইঙ্গিতের পর দাম একদিনেই ৩–৪ শতাংশ পড়ে যায়।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেলপ্রতি ৬৩–৬৪ ডলার এবং ডব্লিউটিআই ক্রুড ৫৯–৬০ ডলারের আশপাশে লেনদেন হচ্ছে।
দামের এই অস্থিরতার বড় কারণ বিশ্বব্যাপী অতিরিক্ত সরবরাহ। যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (ইআইএ) অনুমান করছে, ২০২৬ সালে দৈনিক গড়ে ২.৮ মিলিয়ন ব্যারেল করে তেলের অতিরিক্ত মজুত যোগ হতে পারে। সমুদ্রপথে ট্যাঙ্কারে ভাসমান তেলের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১.৩ বিলিয়ন ব্যারেলে, যা মধ্য-২০২০ সালের পর সর্বোচ্চ। এর একটি বড় অংশই ইরান, রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত তেল, যা ‘শ্যাডো ফ্লিট’ ও অস্বচ্ছ স্টোরেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজারে প্রবেশ করছে। এই অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও তেলের দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজার এখন সীমিত পরিসরে ওঠানামা করছে এবং বড় কোনো দিকনির্দেশনা পেতে বিনিয়োগকারীরা রাজনৈতিক পরিস্থিতির আরও স্পষ্টতার অপেক্ষায় আছেন।
রন বুসোর ভাষায়, “এই অঞ্চলগুলোর সম্মিলিত সরবরাহ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে ব্যবসায়ীরা তা উপেক্ষা করতে পারে না, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাজার ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিকে তুলনামূলক কম গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করছে।”
আন্তর্জাতিক এই অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়তে পারে। তেল আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বৈশ্বিক দামের বড় উত্থান হলে বাংলাদেশের আমদানি বিল ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে, মুদ্রাস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে। আবার দামে স্থিতিশীলতা বা নিম্নমুখী ধারা থাকলে তা অর্থনীতির জন্য স্বস্তির কারণ হবে।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ সালের শুরুতে আন্তর্জাতিক তেলের বাজার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ও অতিরিক্ত সরবরাহের দ্বন্দ্বে অত্যন্ত অনিশ্চিত ও অস্থির অবস্থায় রয়েছে।






