ভারতের ভোটার তালিকা যাচাই: মুসলিম ভোটারদের ভোটাধিকার ঝুঁকিতে

ছবি: সিএনএন

  • বুথ লেভেল অফিসারদের সুইসাইড ও চাপ।
  • অপোজিশনের অভিযোগ: সংখ্যালঘু ভোটার টার্গেটিং।

টুইট ডেস্ক: ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভোটার তালিকা (প্রায় ৯৭ কোটি ভোটার) আপডেটের প্রক্রিয়া, যা ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) নামে পরিচিত, ২০২৫-২০২৬ সালে চলমান রয়েছে। এই প্রক্রিয়া ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে এবং বর্তমানে ড্রাফট তালিকা প্রকাশের পর ক্লেমস এবং অবজেকশনসের পর্যায়ে রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (ECI) বলছে, এটি রুটিন যাচাই যা মৃত, ডুপ্লিকেট এবং স্থানান্তরিত ভোটারদের তালিকা পরিষ্কার করার জন্য। তবে অপোজিশন এবং মানবাধিকার গ্রুপস অভিযোগ করছে যে এতে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে মুসলিম ভোটারদের অধিকার হরণ হচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, উত্তর প্রদেশে (UP) ১২ লাখ নাম ডিলিট হয়েছে লখনৌতে, এবং ওয়েস্ট বেঙ্গলে প্রায় ৫.৮ মিলিয়ন নাম বাদ পড়েছে।

ECI ২০২৫ সালের অক্টোবরে SIR ঘোষণা করে, যা ১২টি রাজ্যে ফোকাস করে। ড্রাফট তালিকা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত হয়েছে, এবং ক্লেমস/অবজেকশনসের শেষ তারিখ ফেব্রুয়ারি মাসে নির্ধারণ করা হয়েছে। তামিল নাড়ুতে স্পেশাল ক্যাম্পস ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ৪ জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিহারে ক্রস-বর্ডার মাইগ্রেশনের কারণে সিটিজেনশিপ যাচাই নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টে বিবেচনাধীন।

UP-এ মুসলিম মেজরিটি জেলাগুলোতে (যেমন সাহারানপুর, মুরাদাবাদ, মুজাফফরনগর, রামপুর, সাম্ভাল) ১৫-১৯% নাম ডিলিট হয়েছে, যা রাজ্যের গড়ের চেয়ে বেশি। ওয়েস্ট বেঙ্গলে ৫.৮ মিলিয়ন ডিলিট, যার অর্ধেক মৃত ভোটার।

পোল ওয়ার্কারসের ক্রাইসিস: প্রক্রিয়ার চাপের কারণে অন্তত ৩৩ জন বুথ লেভেল অফিসার (BLO) মারা গেছেন, অনেকেই সুইসাইড করেছেন। UP-এ BLO-দের এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে যাচাইয়ের জন্য, যা কঠিন এবং চাপপূর্ণ হয়েছে।

মাইগ্রান্ট এবং নাম পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জস

মাইগ্রান্ট ওয়ার্কারস: লক্ষ লক্ষ মাইগ্রান্ট, বিশেষ করে বিহার ও UP থেকে অন্য রাজ্যে গিয়ে বসবাসরত মুসলিম পরিবার, তাদের নাম তালিকায় রাখতে অসুবিধায় পড়েছেন। তাঁদের হোম স্টেটে যেতে হয় ডকুমেন্টস জমা দিতে, যা ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।

নাম পরিবর্তন: বিবাহিত নারীরা স্বামীর নাম গ্রহণ করেছেন, এবং পুরনো ডকুমেন্টের অভাবে অনেকের নাম বাদ পড়েছে। ভোটার যাচাইয়ের জন্য ১২ ধরনের সরকারি নথি (যেমন আধার, প্যান, পাসপোর্ট) জমা দিতে হয়, কিন্তু দরিদ্র ও মাইগ্রান্ট পরিবারে এগুলো নেই।

ডকুমেন্টসের জটিলতা: সংখ্যালঘু এবং দরিদ্র পরিবারে পুরনো ভোটার আইডি বা অন্য নথি না থাকায় ভোট বাতিলের ঝুঁকি রয়েছে। মাইগ্রান্টরা তাদের ভোট কেন্দ্র খুঁজে না পেতে পারায় সমস্যা আরও জটিল হচ্ছে।

মুসলিম ভোটারদের টার্গেটিং: অপোজিশন (কংগ্রেস, AAP, SP, AIMIM) অভিযোগ করেছে যে SIR প্রক্রিয়া BJP-র ‘অ্যান্টি-মাইগ্রান্ট’ ড্রাইভের সাথে যুক্ত, এবং মুসলিম-মেজরিটি এরিয়াসে ম্যাস ডিলিশন হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, UP-এর মুসলিম জেলায় ২০% নাম বাতিল হয়েছে। AIMIM লিডার ওয়াইসি অভিযোগ করেছেন যে এটি মুসলিম ভোটসকে প্রভাবিত করছে। তবে কিছু রিপোর্টে বলা হয়েছে, ডিলিশন রেট ইউনিফর্ম, কোনো কমিউনিটি টার্গেট নয়।

প্রটেস্টস: ২০২৫ সালের আগস্টে অপোজিশন আন্দোলন করে, যেখানে রাহুল গান্ধীকে ডিটেন করা হয়। AAP MP সঞ্জয় সিং অভিযোগ করেছেন যে BLO-দের ফোর্সড ডিলিশন করতে বলা হয়েছে।

ডেমোক্রেসির থ্রেট: গার্ডিয়ান এবং আল জাজিরা রিপোর্ট করেছে যে এই প্রক্রিয়া ডিসেনফ্র্যাঞ্চাইজমেন্টের ভয় সৃষ্টি করছে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু এবং দরিদ্রদের জন্য।

সরকারি এবং ECI-র প্রতিক্রিয়া

গৃহমন্ত্রী অমিত শাহ বলেছেন, এটি কেবল বৈধ ভোটার যাচাই, কোনো বাইয়াস নেই। ECI SIR-এর সময়সীমা রিভাইজ করেছে কিছু রাজ্যে। তবে অপোজিশন বলছে, ECI BJP-র প্রভাবে কাজ করছে।

ভারতের SIR প্রক্রিয়া একদিকে ভোটার তালিকা পরিষ্কার করছে, কিন্তু অন্যদিকে মাইগ্রান্ট, নাম পরিবর্তিত নারী এবং সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে, এটি গণতন্ত্রকে দুর্বল করতে পারে। বর্তমানে ক্লেমস প্রক্রিয়া চলছে, এবং UP ২০২৭ সালের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক হটস্পট হয়ে উঠেছে।

তথ্যসূত্র: CNN (Esha Mitra), গার্ডিয়ান, আল জাজিরা, নির্বাচন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (ECI)