শৈশব ফিরিয়ে দিন

দায়িত্ব কার? রাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি।

ব‌দিউল আলম লিংকন: একটি ছোট্ট ছেলে, লাল গেঞ্জি পরা, ঢাকার একটি ব্যস্ত ভবনের সিঁড়িতে ক্লান্তিতে অচেতনের মতো ঘুমিয়ে আছে। তার চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে রঙিন বেলুন—হাস্যোজ্জ্বল গোলাপি বেড়াল, কালো-সাদা গরু, হলুদ হাঁস, ফুলের নকশা করা স্বচ্ছ বল।

এই বেলুনগুলো তার দৈনিক সংগ্রামের সাক্ষী, তার ছোট্ট হাতের উপার্জনের প্রতীক, আর সেই সঙ্গে তার হারানো শৈশবের করুণ চিত্র।

এই ছবিটি শুধু একটি মুহূর্তের ফ্রেম নয়, এটি বাংলাদেশের লাখো শিশুর জীবনের নির্মম বাস্তবতা। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ফুটপাতে, সিগন্যালে, মার্কেটের মোড়ে বেলুন-খেলনা বিক্রি করে যে শিশুরা দিন পার করে, তাদের অনেকেরই ঘুমের ঠিকানা হয় রাস্তার ধার, দোকানের সামনের সিঁড়ি কিংবা কোনো ভবনের ছায়া। ক্লান্তিতে যখন শরীর আর মানে না, তখন তারা ঠিক এভাবেই ঘুমিয়ে পড়ে—স্বপ্নহীন, নিরাপত্তাহীন, শুধু বেঁচে থাকার জন্য।

এই শিশুটির অপরাধ কী?

সে জন্মেছে দারিদ্র্যের ঘরে। তার বাবা-মা হয়তো দিনমজুর, রিকশাচালক, গৃহকর্মী কিংবা কোনো কাজই স্থায়ী নয়। পরিবারের হাঁড়ি চড়াতে, ভাই-বোনের মুখে দু’মুঠো ভাত তুলে দিতে এই ছোট্ট হাতকেও কাজে নামতে হয়েছে। স্কুলের বই-খাতা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা, মায়ের কোলে আদর—এসব তার কাছে বিলাসিতা। তার জীবনের একমাত্র পাঠশালা হলো রাস্তা, আর শিক্ষক হলো ক্ষুধা।

বাংলাদেশে আইনত ১৪ বছরের নিচে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ। ‘জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন কর্মসূচি’ আছে, আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে, প্রতিবেদন আছে—কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। দারিদ্র্য, অভাব, শিক্ষার অপ্রতুলতা, সামাজিক সচেতনতার ঘাটতি—এসব মিলে এখনো হাজার হাজার শিশু শ্রমের শিকার।

দায়িত্ব কার?

সবচেয়ে বড় দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

যে রাষ্ট্র শিশুদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার কথা সংবিধানে লিখে রেখেছে, তাকে সেই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করতে হবে।

শুধু আইন প্রণয়ন নয়, কঠোর বাস্তবায়ন করতে হবে।
দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য কার্যকর আর্থিক সহায়তা, বিনামূল্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, শিশু-বান্ধব কর্মসংস্থানের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে।

স্থানীয় প্রশাসন, সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর, পুলিশ—সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে যেন কোনো শিশুকে আর রাস্তায় কাজ করতে না দেখা যায়।

একা রাষ্ট্র নয়—আমরা সবাই দায়ী। যে সমাজ এই দৃশ্য দেখেও চোখ ফিরিয়ে নেয়, যে ব্যবসায়ী শিশুদের কাজে লাগায়, যে আমরা সস্তা শ্রমের সুবিধা নিই—আমরা প্রত্যেকেই এই অপরাধের অংশীদার।

এই ছেলেটির ঘুম ভাঙুক না কোনোদিনও এভাবে। তার ঘুম ভাঙুক মায়ের কোলে, স্কুলের ঘণ্টায়, বন্ধুদের হাসিতে। তার চারপাশে বেলুন থাকুক খেলার জন্য, বিক্রির জন্য নয়।

আমাদের দেশের প্রতিটি শিশু যেন বলতে পারে—
“আমি শিশু, আমি শ্রমিক নই।”
রাষ্ট্র, এদের দায়িত্ব নিতে হবে।

এখনই। আজই। কারণ প্রতিটি হারানো শৈশব আমাদের সকলের ব্যর্থতা।